বাকলা চন্দ্রদ্বীপ থেকে রত্নগর্ভা বরিশাল
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:২৩
ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। গাঙ্গেয় অববাহিকার এই জেলার বয়স দু’শ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রাচীন নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ। দেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী ঘেঁষে গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পলি জমে ১২টি দ্বীপের জন্ম হয়েছিলো। সেই দ্বীপগুলোই কালের বিবর্তনে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর ও বরিশাল জেলায় রূপান্তর হয়েছে। এরমধ্যে বরিশালসহ কয়েকটি জেলা বিভাগীয় শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। বরিশাল ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত বাকলা- চন্দ্রদ্বীপ নামেই পরিচিত ছিলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকাই এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রাচীনকাল থেকেই নদীভাঙ্গন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করে বেঁচে থাকা মানুষের পেশা কৃষি ও মত্স্য শিকার। একদা এ অঞ্চলে বনে-জঙ্গলে পশু-পাখি শিকার করে যাযাবর জীবন-যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে অবারিত উর্বর জমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। ব্যাপক কৃষি উত্পাদনের মধ্য দিয়ে বরিশাল পরিচিতি লাভ করে বাংলার শস্যভান্ডার হিসাবে।
ইতিহাস থেকে জানা যায় চন্দ্রদ্বীপ গঙ্গার মোহনায় অবস্থিত ছিলো। লোকবসতি কবে শুরু হয়েছে তার সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও রামায়ণ ও মহাভারতে সাগর দ্বীপের যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে চন্দ্রদ্বীপ গঙ্গার মোহনায় অবস্থিত ছিলো। রামায়ণ ও মহাভারতের ভাষ্য অনুযায়ী বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের জন্ম ৪ হাজার বছর পূর্বে বলে ধারণা পাওয়া যায়। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় চন্দ্রদ্বীপে বসতি গড়ে উঠে। প্রাচীন এই দ্বীপের জন্মের পরও অসংখ্য নদী-নালায় ভরপুর ছিলো। এখনো মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, কালাবদর, ঝুনাহার নদী ঘিরে রেখেছে ঐতিহ্যবাহী এ জেলাকে। সুগন্ধা নদী নিয়ে সনাতন ধর্ম মতে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে পাবনী, হলদিনী ও নলীনির মিলিত মোহনায় তারাদেবীর নাসিকা পড়েছিলো। সেজন্য ত্রি-ধারার মোহনার নামকরণ করা হয় সুগন্ধা। নাসিকা দিয়ে সুঘ্রাণ নেয়া হয় বলে ঐ মোহনার নাম তখন থেকেই সুগন্ধা হিসেবে পরিচিতি পায়। বরিশালের অধিকাংশ নদী সুগন্ধা হতে উত্পন্ন হয়েছে। কালিজিরা নদীর অংশবিশেষকেও সুগন্ধা নদী হিসেবে বিভিন্ন মানচিত্রে উল্লেখ রয়েছে। দেশের দক্ষিণ এ ভূখন্ডের রাক্ষুসী নদীগুলো বার বার ভৌগোলিক অবস্থান রদবদল করেছে। নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় বারবার পরিবর্তন হয়েছে মানচিত্র। এডুমিশ্রের কারিকায় বলা হয়েছে চন্দ্রকলার মতো এ দ্বীপের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়েছে বলেই নামকরণ করা হয়েছে চন্দ্রদ্বীপ। তখনো পূর্বে ইছামতি ও পশ্চিমে মধুমতি নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিলো বরিশাল।
জেলার জন্ম ২১৬ বছর পূর্বে
১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জে প্রথম জেলা স্থাপিত হয় । ১৮০১ সালে বাকেরগঞ্জ থেকে জেলার সদর দপ্তর আনা হয় বরিশালে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ও ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ছিলো খুলনা বিভাগের অন্তর্গত ছিল। কালের বিবর্তনে জেলা শহর রূপ নিয়েছে বিভাগীয় শহরে। সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামল সুন্দরে ভরা জীবনানন্দের রূপসী বাংলার চিরচেনা মুখ এই বরিশাল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালের রূপ সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে নাম দিয়েছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে এ শহরের আত্মীয়তার ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। রবী ঠাকুরের যাতায়াত ছিল এই বরিশালে। এখানে জন্ম নিয়েছেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, সাংবাদিকতার পথিকৃত্ নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কবি সুফিয়া কামাল, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা অগ্নিপুরুষ বিপ্লবী দেবেন্দ নাথ ঘোষ, কমরেড নলিনীদাস, মনোরমা মাসিমাসহ অনেক ক্ষণজন্মা পুরুষ। একুশে ফেব্রুয়ারির মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বরিশালের রয়েছে গর্বিত ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’ গানের রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী, গানটির সুরকার ও শিল্পী আলতাফ মাহমুদ জন্ম নিয়েছেন এ জেলায়। আলতাফ মাহমুদের নামে নগরীতে রয়েছে সংগীত বিদ্যালয়। এছাড়াও স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, বীর উত্তম আব্দুস সত্তার ও মেজর জলিলকে নিয়ে এখানকার মানুষ এখনো গর্ববোধ করে। প্র্যাচ্যের ভেনিস অপরূপ সৌন্দর্য্যের বরিশালের নতুন উপাধি মিলেছে রত্নগর্ভা বরিশাল হিসেবে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের শৈশব-কৈশোর ও শিক্ষকতা জীবন কেটেছে এই শহরে। একইভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অপর নেতা চারণ কবি মুকুন্দ দাশের শৈশব-কৈশোর কেটেছে এই শহরকে ঘিরেই। তাদের স্মৃতি ঘিরে রেখেছে রূপ-সৌন্দর্য্যের এ নগরী।
ঐতিহাসিক দুর্গা সাগর
১৭৮০ খৃষ্টাব্দে চন্দ্রদ্বীপ পরগোনার তত্কালীন রাজা শিব নারায়ণ এলাকাবাসীর পানির সংকট নিরসনে মাধবপাশায় দক্ষিণ বঙ্গের বৃহত্তর একটি দীঘি খনন করেন। তার মা দুর্গা দেবীর নামে দীঘিটির নামকরণ হয় দুর্গাসাগর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিবর্তে দুর্গাসাগর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে জেলা প্রশাসন। দুর্গাসাগরের তিন দিকে ৩টি ঘাটলা ও দীঘির ঠিক মাঝখানে ৬০ শতাংশ ভূমির উপর টিলা রয়েছে।
দুর্গাসাগরের অদূরেই রয়েছে অত্যাধুনিক বায়তুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হক যাদুঘর। এ যাদুঘরটি বানারীপাড়ার চাখারে শেরেবাংলার জন্ম ভিটায় অবস্থিত। দুর্গাসাগরে এক সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির সমাগম হতো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সর্বশেষ ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সুপার সাইক্লোন সিডর’র পর দুর্গাসাগরে আর অতিথি পাখির দেখা মিলছে না।
আড়াইশ’ বছর পূর্বে খনন করা ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর ও তার অদূরেই লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটিও দর্শনীয় স্থান হিসাবে পরিচিত। লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি তিনশ’ বছরের পুরনো চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালিবাড়ি
যে লোকটি মৃত্যুর পূর্বে বলে গেছেন আমার জন্মস্থান বিক্রমপুর। এটা শোনা কথার স্মৃতি ব্যতীত আর কিছু নয়। যে আবেষ্টনকে মানুষ জন্মভূমি নামে ভালবাসে ও শ্রদ্ধাভক্তি করে তা আমার কাছে বরিশাল। সেই বরিশালেই চারণ কবি মুকুন্দ দাসের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি এখন কালিবাড়ি হিসেবে পরিচিত। কালিপূজার জন্য মন্ডপ ঘর ও অপর ঘরগুলোতে চলে লাইব্রেরী ও ললিতকলায় পাঠ দান। একটি দাতব্য চিকিত্সালয় রয়েছে। প্রতি মাসে অমাবশ্যায় এখানে কালি পূজায় ভক্তদের ভিড় জমে। মন্দিরের গেটে রয়েছে নাগ মন্দির। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত সহ কংগ্রেসের নেতারা পৌরসভার বাইরে মুকুন্দ দাশের এ বাড়িতেই আন্দোলন সংগ্রামের কৌশল নির্ধারণের জন্য গোপনে বৈঠক করতেন।