রবীন্দ্র নজরুল গান্ধীর স্মৃতিধন্য শহর

মহত্মা গান্ধী ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যাতায়াত ছিল এই শহরে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একবার বরিশাল এলেও মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন বহুবার। কবি নজরুল এই শহরের রূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আখ্যা দিয়েছিলেন প্রাচ্যের ভেনিস। তিনি মৃত্যুক্ষুধা নাকটটি লিখেছিলেন বরিশালকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চন্দ্র দ্বীপের (বরিশালের আদি নাম) রাজা রামচন্দ্র রায়ের স্ত্রী বিভাবতীকে (বিমলা) নিয়ে ‘বৌ-ঠাকুরানীরহাট’ নামের একটি উপন্যাস রচনা করেন। আর মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য এ শহরে যাতায়াত করতেন। সর্বশেষ তিনি ১৯০৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে যোগ দিতে বরিশালে এসেছিলেন। তত্কালীন উপ-মহাদেশের মধ্যে মহাত্না উপাধী পাওয়া অপর জন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের বাড়িতেই মহাত্মা গান্ধী থাকতেন বলে জানা গেছে। কংগ্রেসে’র ঐ অধিবেশনে অশ্বিনী কুমার দত্ত সভাপতি ছিলেন। তবে মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসে’র তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক রজনীকান্ত সেন ও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়িতে যাতায়াত করতেন। রজনী কান্ত দাস এখানের মিউনিসিপলিটির আজীবন চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সাথে আইন পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। শুধু যে কংগ্রেসের রাজনীতির টানে মহাত্মা গান্ধী বরিশালে এসেছিলেন তা নয়। রত্মগর্ভা এই নগরীতে পা পড়েছিল নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বরিশালের সাথে তার বাণিজ্যিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, রবীন্দ্র হইয়া মোকাম পরিদর্শক নগেন্দ্রকে পাঠাইয়াছি। বরিশালের দুষ্টু লোকেরা আখ মাড়াই, কড়াই আত্মসাত্ করিয়াছে। স্থানীয় কর্মচারী সঠিক হিসাব দেখায়নি’। বরিশালে কবিগুরু তার মেয়ে মীরা দেবীকে বিয়ে দিয়ে এবং আখের কল স্থাপন করে চরম খেসারত দিয়েছিলেন বলে ঐ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠির সূত্র ধরে ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা গেল রবীন্দ্রনাথের বরিশালের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আরো অনেক ছিল। লাকুটিয়ার জমিদার রাখাল চন্দ্র রায়ের একমাত্র পুত্র ছিল দেবকুমার রায়। তার দু’কন্যা সুশীলা ও চারুশীলা ছিল খুবই সুন্দরী ও জ্ঞানী। ঐ দু’ বোনকে বিয়ে করেছিল রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই দ্বিজেন্ত্রনাথ ঠাকুরের দু’পুত্র দীপেন্দ্রনাথ ও অরুণেন্দ্রনাথ। শুধু ভাইয়ের মেয়ে নয়, রবীন্দ্রনাথ তার ১৪ বছর বয়স্কা কনিষ্ঠ কন্যা মীরাদেবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন নগরীর হাসপাতাল রোডে। ব্রাহ্ম সমাজের নেতা শ্রী বামুন দাশ গাঙ্গুলীর পুত্র নগেন্দ্র গাঙ্গুলীর সাথে ১৯০৭ সালের জুন মাসে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। জামাই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ বেড়াতে এসে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। তখন বরিশালের স্থানীয় গুণীজনদের সাথে আলোচনা করে একটি সাহিত্য পরিষদ খোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯০৭ সালের ২৮ জুন রবীন্দ্রনাথের জামাতা নগেন্দ্র গাঙ্গুলী উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকায় চলে যান। ১৯৬৯ সালে মীরাদেবীর মৃত্যু হয়। তাদের সংসার জীবন সুখের ছিল না। তাই রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে চিঠিতে লিখেছিলেন ‘ওর জীবনের প্রথম দণ্ডতো আমিই দিয়েছি। ভাল করে না ভেবে না বুঝেই আমি ওর বিয়ে দিয়েছি...’। বরিশালের ইদিলপুর পরগনায় কলকাতার ঠাকুরস্টেটের জমিদারি ছিল। ঐ জমিদারিতে অংশ ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বরিশালের সাথে কবিগুরুর রক্তের সম্পর্ক ছিল। এখানকার সু-সাহিত্যিক দেবকুমার রায় ছিলেন কবির একান্ত ভক্ত। ১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল বরিশালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন তিনি আগরতলায় অবস্থান করতেন। ঐ বছর ৮ এপ্রিল বরিশালে পাঠানো এক চিঠিতে কবি লিখেছিলেন ‘ঘুরিয়া মরিতেছি, সমপ্রতি আগরতলায় আটকা পড়িয়া গিয়াছি। বরিশালে যাইতে হইবে....’। ১৪ এপ্রিল কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন শুরু হলে পুলিশ তাতে হামলা চালিয়ে জনতাকে নির্যাতন করেন। রবীন্দ্রনাথ আগরতলা থেকে রওয়ানা হয়ে নৌপথে ১৫ এপ্রিল দুপুরে বরিশালে পৌঁছান। তখনো পুলিশের সাথে কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছিল। এ সংবাদ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ নগরীতে প্রবেশ না করে ভাটার খালের কাছে বজরাতে অবস্থান করতে থাকেন। সেখানে সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোক্তা দেবকুমার রায় চৌধুরীসহ অন্য নেতারা তার সাথে সাক্ষাত্ করেন। সাহিত্য সম্মেলনের পরিবেশ না থাকায় রবীন্দ্রনাথ দুঃখ প্রকাশ করেন। পরের দিন কবি বরিশাল থেকে ফিরে যান। ১৬ এপ্রিল রওয়ানা দিয়ে ১৭ এপ্রিল পৌঁছান শান্তি নিকেতনে। বরিশালবাসীর সাথে তার দেখা না হওয়ার খবর প্রকাশিত হয় দি বেঙ্গলী পত্রিকায়। সেই থেকে প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছেন বিশ্বনন্দিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর কবি নজরুল ইসলাম কত সালে কি উদ্দেশ্যে বরিশাল এসেছিলেন তা জানা যায়নি। তবে তার আগমন নিয়ে লেখালেখিতে বরিশালের বর্ণনা তুলে ধরেন।