ঝড়ের মাঝে বসবাস

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে দক্ষিণ উপকূলের মানুষ। সাগর থেকে জেগে উঠা ভূ-ভাগে জনবসতি গড়ে বাকলা চন্দ্রদ্বীপ আজ বরিশালে রুপান্তর হলেও প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, টর্নেডো এখানকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী । জীবনযুদ্ধের বেশিটা সময় পার হয়ে যায় ঝড়ের সাথে লড়াই করে। এ যেন বাঁচার লড়াই। শত শত বছর ধরে এ লড়াই চলে আসছে। প্রতিবারই এখানকার অধিবাসীদের এ লড়াইয়ে পর্যুদস্ত হয়েছে। হারিয়ে গেছে বহু অমূল্য প্রাণ, সহায় সম্পদ। নিঃস্ব হয়ে গেছে লোকজন। বাঁচামরা তাদের জন্য সমান। বারবার স্তব্দ হয়ে গেলেও জীবন থেমে নেই তাদের। বাঁচার জন্য হয়ত আজীবন লড়াই করতে হবে । ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বারবার লণ্ডভণ্ড হয়েছে বৃহত্তর বরিশালসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। ১৫৮৪ সালের ঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল উপকূলের দু’লাখ মানুষ। ইতিহাসবিদদের মতে ঐ প্রথম ঝড় আঘাত হাতে উপকূলভাগে। ১৬৯৯ সালে তত্কালীন সুন্দরবন সংলগ্ন সাগর দ্বীপের উপর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর ৬০ হাজার লোক মারা যায়। ১৭৩৭ সালের ঝড়ে দক্ষিণাঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৭৬০ সালে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে অর্ধলক্ষ লোক নিহত হয়। ১৭৬২ সালের এপ্রিলের ঝড়ের সাথে ভূমিকম্প হয়েছিল। তত্কালীন বাকেরগঞ্জ জেলায় ঐ সময় বিলের সৃষ্টি হয়। ১৭৬৫ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়। সকল জনবসতি তখন নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। প্রাণ হারায় ৪০ হাজার আদম সন্তান। ১৭৬৭ সালে উপকূলে আঘাত হানে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। সাথে ছিল ভূমিকম্প ও ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। তখন মারা যায় ৩০ হাজার লোক। জনবসতি ছিল না একটিও। ১৭৮৭ সালের প্লাবনের পর দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। তত্কালীন বাকেরগঞ্জের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। ঐ প্লাবনের ফলে আড়িয়াল খা নদী হতে প্রবাহিত একটি খাল এক রাতে মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে নয়া ভাঙ্গনী নদীর জন্ম দেয়। প্লাবনে বাকেরগঞ্জের ( বরিশালের পূর্বের নাম) সমস্ত ফসল নষ্ট হয়। শুরু হয় মহাদুর্ভিক্ষ। ৬০ হাজার লোক দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা কাটাতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যায়। তত্কালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. ডগল্যাসের রিপোর্ট অনুযায়ী ঝড়ে দুই-তৃতীয়াংশ লোক নিহত হয়। ফলে বাকেরগঞ্জের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জনশূন্য হয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়। তখন এক-তৃতীয়াংশ ভূমিতে চাষ বন্ধ হয়ে যায়। বাঘ-শূকরসহ উপকূলে বণ্যপ্রাণীর আনাগোনা বাড়ে। কোম্পানি আমলে বাকেরগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে স্মরণীয় বড় ঝড় হয় ১৮২২ সালের ৬ জুন। ঐ ঝড়ে সমগ্র জেলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এক লাখ লোক ঝড়ে ও ৩৯ হাজার ৯৪০ জন জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। সে আমলে সোয়া ১৩ কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। ৬ জুন দুপুরে ঝড় শুরু হয়েছিল। রাত ৯ টায় তা তীব্র আকার ধারণ করে। পরদিন সকালে তীব্রতা কমে আসে। এশিয়াটিক জার্নালের মতে এ ঝড়ে এক লাখ লোক মারা যায়। ঐ ঝড়ে বাকেরগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মনপুরার অধিবাসী ও গবাদিপশু নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। একমাত্র বাকেরগঞ্জ জেলায় ১০ হাজার ৯৮৪ জন নিহত হয়। ঝড়ের পরদিন খাবার দিতে না পারায় হাজতীদের জেল হতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৫৮৪ সালের পর এটাই ছিল বড় ধরনের ঝড়। ১৮২৫, ১৮৩১ ও ১৮৩২ সালেও ঝড় আঘাত হেনেছিল। ১৮৩৩ সালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় হেরিকেনে রূপ লাভ করে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ১৮৫৫ সালেও ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে। ১৮৬৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ে মারা যায় ৮ হাজার লোক। ১৮৬৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবন থেকে পাবনা পর্যন্ত ধ্বংসলীলা চালায়। মারা যায় ২৫ হাজার লোক। ১৮৭৬ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বরিশালের মনপুরা ও চরফ্যাশনের বিরাট এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯১৯ সালের ঘূণিঝড় বরিশালের উপর আঘাত হানে। ১৯৬১ সালে মেঘনা মোহনার উপর দিয়ে দেড়শ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। ১৯৬৩ সালে নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মাইল এলাকা তছনছ করে দেয়। ১৯৬৫ সালের মে ও ডিসেম্বর মাসে দু’টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে এখানে। ঐ বছর ঝড়ে মারা যায় ২৫ হাজার লোক। ১৯৬৬ সালে ৫টি থানার উপর দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে উপকূল ভাগের ৫ লাখ লোক প্রাণ হারায়। ২৫০ কিলোমিটার বেগের বাতাসের সাথে ছিল ১৫/২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। তখন উপকূলীয় জনপদ বিলীন হয়ে যায়। ২০০৬ সালের সামুদ্রিক ঝড়ে প্রাণ হারায় শত শত জেলে। পরের বছর ১৫ নভেম্বরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে এ জেলায় ব্যাপক হতাহতের পাশাপাশি বিপুল সম্পদ বিনষ্ট হয়। সর্বশেষ গত ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন এর আগে সিডরই ছিল স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগ। সিডর মোকাবেলা করে মহাসেন এর আঘাত নিয়ে বেঁচে আছে এখানকার বাসিন্দা। সিডর আঘাত হেনেছিল ২২০ থেকে ২৪০ কিলোমিটার গতিবেগে। সিডর ও মহাসেন এর মধ্যে আইলাসহ ছোটখাটো বেশকিছু ঝড় স্মরণীয় হয়ে আছে এখানকার মানুষের কাছে। ১৯৮৪ সালের মে মাসে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে এ অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তখন উড়িরচর নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। বলতে গেলে প্রতি বছরই ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে উপকূলবর্তী এ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় । ১৯৯৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সাগর থেকে উপকূলভাগে উঠার সময় শক্তি হারিয়ে ফেলে। দুর্বল গতিতে মেঘনা মোহনা অতিক্রমকালে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নদীর তীরবর্তী জনপদ। নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধে দুর্বল ঝড় রেখে যায় তার ধ্বংসযজ্ঞের কিছু স্মৃতি। ৭০’র ঝড়ের সময় উপকূলের ৫ লাখ লোক প্রাণ হারালেও পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী সেদিকে ফিরে তাকায়নি। স্বাধীনতাত্তর সরকার উপকূল ভাগের লোকজনকে রক্ষার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিভিন্ন দুর্গম বসতিতে শুরু হয় আশ্রয় কেন্দ্র, বেড়িবাঁধ, রিংবাঁধ, ক্রসড্যাম নির্মাণের কাজ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে উপকূল নিয়ে তার সকল পরিকল্পনা থমকে দাঁড়ায়। পরবর্তী সরকারগুলো উপকূলের মানুষের কাছে শুধু বারবার নির্বাচনের সময় ভোটভিক্ষা চাইতে এসেছে। উপকূলবাসীর জানমাল রক্ষায় কখনই পরিকল্পিতভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সরকারের আমলে সাইক্লোন শেল্টার, বেঁড়িবাধ ও শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের নামে কোটি কোটি টাকার হরিলুট হয়েছে। ১৫ নভেম্বরের ভয়াল সিডর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বহু বছরের পুরনো অনেক বেড়িবাঁধ এখন নিশ্চিহ্ন। উপকূলের লোকজনের জীবনের এখন কোন নিরাপত্তা নেই। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদীর বুক চিরে নতুন চর জেগে উঠেছে। এসব চরে লক্ষ লক্ষ লোক বাস করে। জনবসতি গড়ে উঠলেও নেই প্রয়োজনীয় আশ্রয় কেন্দ্র ও বেড়িবাঁধ। প্রকৃতির রুদ্র রোষের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় এখানকার মানুষকে। প্রায়ই হানা দেয় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস। তাই লড়াই করতে করতে তারা সাহসী হয়ে উঠেছে। এককালে বরিশাল অঞ্চলকে বলা হত ঝড়ের দেশ, বানের দেশ। তখন বরিশালের এলাকা ছিল বিরাট। গোটা উপকূল ভাগের বিশাল অংশ ছিল এ জেলার অধীনে। এখনো এ নাম মুছে যায়নি। এ কারণেই লোকজন এ এলাকায় আসতে এখনো ভয় পায়। তারা ভয় পায় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসকে। কিন্তু উপকূলবাসীর গা সওয়া হয়ে গেছে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সিডরের বা মহাসেন এর পর কোন দুর্যোগ আসলে তারা হয়ত জানমাল সঁপে দিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু স্বাধীন দেশের সরকারগুলো কিংবা বিশ্বব্যাপী যারা মানবাধিকার কিংবা মানুষের অধিকারের কথা বলে নিজেদের নেতা দাবি করেন তাদের কি কিছুই করার নেই। এই প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও খুঁজে পায়নি অবহেলিত এ জনপদের মানুষ।