বরিশালের রূপালী ইলিশের সেই সোনালী দিন আর নেই

নানামুখী সংকটে জেলেরা

বরিশালকে বলা হয় ইলিশের দেশ। বরিশালের এই রূপালী ইলিশ উপকূলীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে ইলিশে দুষপ্রাপ্যতার পাশাপাশি ঝড়-ঝঞ্ঝা ও জলদস্যুতা নড়বড় করে দিয়েছে জেলেদের অস্তিত্ব। পাশাপাশি ডাকাত ও জলদস্যুদের তাণ্ডব বেড়েছে বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে মেঘনা মোহনায়। ঝড় ও ডাকাতের কবলে সর্বস্ব হারিয়ে বিপন্ন হয়ে উঠেছে জেলেদের জীবন। স্বজনহারা সেসব জেলের জীবনচিত্র নিয়ে একাধিক জেলেপল্লী ঘুরে এসে বরিশাল জেলা পাতার এ বিশেষ আয়োজনে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আমাদের বরিশাল অফিস প্রধান - লিটন বাশার যেমন কাটছে জেলেদের জীবন বঙ্গোপসাগরের লোনা জলের আছড়ে পড়া ঢেউ ভেঙ্গে এক সময় যারা দেশি বিদেশি মানুষকে রূপালী ইলিশের স্বাদ জোগাত সেসব পরিবারের মাঝে এখন শুধুই হাহাকার। একের পর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও ডাকাত-জলদস্যুদের তাণ্ডবে জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দুর্বিসহ অভাব-অনটন। জেলেপল্লীর বাসিন্দাদের জীবনের সবকিছু যেন দিনে দিনে ওলোট-পালোট হয়ে যাচ্ছে। পাথরঘাটার জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত পদ্মার স্লুইচ, জ্ঞানপাড়া, জিনতলা, নিশানবাড়িয়া-গর্জনবুনিয়া কিংবা ভোলার ঢালচর, চর কুকুরী-মুকুরী, পাতিলা, চর জহির উদ্দিন, মনপুরা চর নিজাম, তজুমদ্দিনের শশীগঞ্জ বেড়িবাঁধে অথবা মেঘনার তীরবর্তী হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এলাকার জেলেপল্লীগুলোতে এখন প্রায় একই চিত্র । জেলেদের সেইদিন আর নেই হিজলা বা মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মতই একটি উপজেলা পাথরঘাটা । পার্থক্য শুধু প্রথম দু’টি উপজেলা মেঘনার তীরবর্তী। আর পাথরঘাটা হচ্ছে দেশের সর্ব দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি উপজেলা । তবে তিন উপজেলার মানুষের মধ্যে মিল হচ্ছে তাদের প্রধান পেশা নদী কিংবা সাগরে গিয়ে ইলিশ মাছ শিকার করা । প্রবহমান মেঘনা বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত যে গতিপথে বয়ে গেছে তার দুই তীরের বাসিন্দারাই মূলত নদী ও সাগর মোহন থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলরাশিতে ইলিশ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, বঙ্গেরচর, রাজাপুর, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, মনপুরা, চরফ্যাশন হয়ে দেশের সর্ব দক্ষিণের পাথরঘাটা পর্যন্ত অসংখ্য জেলেপল্লী রয়েছে। পাথরঘাটা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরবর্তী সমুদ্রের কুল ঘেঁষে এক সময় যে চরটি জেগে উঠেছিল তার নামই পদ্মা। সমুদ্রের লোনা জল পাথরঘাটা উপজেলায় যাতে উঠতে না পারে সে জন্য সেখানে স্লুইচ গেট নির্মাণ করার পর এলাকাটির নাম হয় পদ্মা স্লুইচ। জেলেপল্লীর পাশাপাশি ইলিশ বেচাকেনার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে একটি মিনি মার্কেট। চরে বসত গেড়ে বসেছে শত শত জেলে পরিবার। এসব বাড়িঘর থেকে সমুদ্রের গর্জন সর্বত্র শোনা যায়। অবিরাম বয়ে চলে প্রচন্ড বাতাস। পাশেই হরিণঘাটা বেলাভূমি। প্রকৃতির রংতুলি দিয়ে যেন কোন চিত্রশিল্পী তার মনের মাধুরী মিশিয়ে এলাকাটিকে সাজিয়ে তুলেছে। সেখানকার মত্স্য শিকারীরা পাথরঘাটা উপজেলা সদর কিংবা কোন শহর জনপদ লোকলয়ে আসা-যাওয়ার সুবিধা বিবেচনা করে আবাসস্থল তৈরি করেন না। তাদের দৃষ্টি থাকে কি করে দ্রুত সমুদ্রে যাতায়াত করা যায়। সাগর কিংবা নদীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়তেই যেন তীরবর্তী এলাকায় এরা ঘর তৈরি করে বাসা বাঁধে। অভাব-অনটনের সংসারে পরিবার-পরিজন নিয়ে দু’ বেলা দু’ মুঠো খাবারের জন্য তারা তাকিয়ে থাকেন সাগরের অথৈ জলরাশির দিকে। সাগরের কুল ঘেঁষে তেমনি একটি ঘর শাহ আলম মাঝির। ৪ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে যে ছোট্ট ঝুপড়িঘরে তিনি বসত গড়েছেন তার অধিকাংশই দখল করে আছে জাল ও মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী। ছোট্ট একটি চৌকির উপরে ৬ জনে মিলে কোনরকম রাত কাটান। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে সাগরে আসা-যাওয়া করেন। কখনো রাত কখনো দিন। যখনই মহাজনের ডাক আসে তখনই নৌকা কিংবা ট্রলার নিয়ে ছোটেন গভীর সমুদ্রে। ঘরে ফিরে আসার মনোবাসনা নিয়ে সাগরে গেলেও অনেকেরই আর ফেরা হয় না। দেখা হয় না প্রিয় সন্তান, স্ত্রী কিংবা বাবা-মায়ের মুখ। এ রকম না ফেরার ঘটনা সাগরে অহরহ ঘটে। প্রকৃতির রুদ্ররোষ প্রায়ই জেলেপল্লীর তাজা প্রাণগুলো কেড়ে নিয়ে যায়। জেলেদের কাছে সিডরের আগে আছে ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের সামুদ্রিক ঝড় এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে । ঐ ঝড়ে শাহ আলমের প্রতিবেশী ছগির, বাদশা মিয়া, ইউনুস জমোদ্দার, শাখাওয়াত আলী, নূর মোহম্মদ, রফিক, সাহাসাব, বারেক ও রহমান নিখোজ হন। সিডরে নিখোজ হওয়া শত শত জেলে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে উপকূলে ফিরে এলেও ফিরে আসেনি সিডরের আগের বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়া জেলেরা। ঐ ঝড়ে ৮ জেলের মৃত্যুর বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে পাথরঘাটার সোহেল জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন বন্দুয়াখালী এলাকায় তাদের ট্রলারটিও ঝড়ের কবলে পড়ে। ৩/৪ ঘন্টা ট্রলারের পানি সেচে তারা কোনরকমে ট্রলারটি চালু রাখেন। এক পর্যায়ে মাঝি ট্রলারটি চরে ঠেকিয়ে দিয়ে তাদেরকে ঝাঁপ দিতে বলেন। তাদের ট্রলারেও ১০ জন মাঝিমাল্লা ছিল। তারা সাঁতরে সুন্দরবন সংলগ্ন একটি স্থানে জড়ো হন। ট্রলার থেকে ভেসে আসা একটি কাঁথা জড়িয়ে ১০ জন গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় তাদের জীবন যখন বিপন্ন তখন বনের বাঘের ভয় আসে মনে। সুন্দরবনের বাঘ তাদের খেয়ে ফেলতে পারে এমন আশংকায় তারা একে অপরকে ছেড়ে অন্য কোথাও যায়নি। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সোহেল তারই বন্ধু ছগিরের ট্রলারটি ভেঙ্গে চুরমার হতে দেখেছে। জেলেরা কে কোথায় ভেসে গেছে তার কোন হদিস নেই। তবে তার দীর্ঘদিনের চেনা ছগিরের ট্রলারটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়ার পরও তার চিনতে কষ্ট হয়নি। ঐ গ্রামের নান্টু নামের অপর এক জেলেও ঐ রাতে ইলিশ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে শাহজামাল, নূর আলম ও বাদল ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে পরদিন সাগরে যায়। তারাও আর ফিরে আসেনি। পরের বছর ১৫ নভেম্বর ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডরে হারিয়েছে উপকূলের শত শত জেলে। যাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন গত বছর ফিরে এসেছে। জন্মভিটায় ফিরলেও তারা এখন মানসিক ভারসাম্যহীন। জীবনের ৫টি বছর তারা কে কোথায় ছিলেন তাও জানা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ বলছে ভারতের জেলে বন্দী ছিল। আবার কেউ বলছে সুন্দর বনের গহীন অরণ্যে হারিয়ে গিয়েছিল এ সব জেলে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কয়েকজন ফিরে এলেও সিংহভাগ নিখোঁজদের আশা ছেড়ে দিয়েছেন পরিবার পরিজন। ঝড়ের সাথে গত কয়েক বছর ধরে যুক্ত হয়েছে ডাকাত ও জলদস্যুদের অত্যাচার। সাগর বা নদীর মোহনায় ইলিশ শিকারে গেলেই জেলেদের পড়তে হয় দস্যুদের কবলে। কখনো জেলে নৌকা বা ট্রলারসহ মাছ লুট, জেলেদের মারধর করে পঙ্গু করে দেওয়াসহ হরেক অত্যাচার। আবার কখনো শুধু জেলে নৌকা বা ট্রলারের মাছ লুট করেই শেষ নয়। অপহরণ করে নিয়ে যায় জেলেদের। পরে জলদস্যুদের আস্তানা থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করতে হয় অপহূত জেলেদের। জেলে বা ট্রলার জলদস্যুদের কাছ থেকে মুক্ত করতে মোটা অংকের টাকা গুনতে গুনতে এখন মহাজনদের অবস্থায়ই বেগতিক। তারা এ পেশায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। আর যারা মাছ ধরার জন্য ট্রলার ও জালের মালিকের কাছ থেকে শিকারকৃত মাছ বিক্রির টাকার অংশ চুক্তি অনুযায়ী পেত তাদের পরিবারগুলো এখন দিশেহারা। জেলেদের কাছে মাঝিই শেষ ভরসা সাগরের মত্স্য শিকারে যাওয়া ট্রলারের মাঝি জেলেদের কাছে জাহাজের ক্যাপ্টেনের মত। তার আদেশ-নির্দেশ অমান্য করেন না। মাঝিকে মহাজন বেতনও দেন বেশি। কোথায় জাল ফেলতে যেতে হবে, কিভাবে কোন পথে উপকূলে ফিরতে হবে- সব কিছুই নির্ধারণ করেন মাঝি। ঝড়ের কবলে পড়লে মাঝির নির্দেশ ছাড়া জেলেরা সাগরে ঝাঁপ দেয় না। মাঝি ট্রলারটি ভাসিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে ট্রলার ডুবে যাওয়ার পূর্বে তিনি কোন চরে ট্রলারটি ঠেকিয়ে দিয়ে জেলেদের বাঁচার জন্য ঝাঁপ দিতে বলেন। তাই মাঝির উপর নির্ভর করেই তারা পথ চলেন। আবার ডাকাত বা জলদস্যুরা ধাওয়া করলে মাঝিই ট্রলারটি নিরাপদ দূরে সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাঝির নির্দেশেই জেলেরা ডাকাতদের প্রতিহত করতে লাঠিসোঁঠা হাতে নেয়। আবার মাঝি বললে চুপচাপ ট্রলারের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। বড় কোন জলদস্যুদের কবলে পড়লে মাঝিমাল্লারা একত্রে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর নিরন্তর চেষ্টা করেন। কিন্তু সকলের আর বেঁচে থাকা হয় না। সাগরের অথৈ জলে ডুবেই জীবন দিতে হয়। মাঝেমধ্যে মাঝির নির্দেশে জেলেরা নিজেদের আত্মসর্মপণ করে জলদস্যুদের সাথেই প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে চলে যান নির্জন আস্তানায়। পরে মহাজন তাদের নানান অংকের টাকায় মুক্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তবে জলদস্যুদের সাথে এ মুক্তিপণ নিয়ে দীর্ঘ দেন-দরবার ও চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ পরিশোধ করে জেলেদের মুক্ত করতে সপ্তাহ পেরিয়ে কখনো মাস কেটে যায়। এই দীর্ঘদিন অপহূত জেলেদের চরম শংকায় থাকতে হয় জলদস্যুদের আস্তানায়। আর জলদস্যুদের হাতে অপহূত জেলে পরিবারগুলো থাকেন চরম উদ্বিগ্ন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ায় চুলায় আগুন জ্বলে না। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোটে না। বরং তারা থাকেন নিখোঁজ স্বজনের সুস্থভাবে ফিরে আসার প্রতীক্ষায়। যে কারণে জেলেরা ঝড়ের পূর্বাভাস পায়নি জেলেরা জানায়, সিডর, আইলা ও সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় মহাসেন সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক সংকেত পেলেও এর আগে বা ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের সামুদ্রিক ঝড়ের সময় তারা তেমন কোন পূর্বাভাস পায়নি। বিশেষ করে ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের দু’দিন পূর্বেও সমুদ্রে বান এসেছিল বলে জেলেরা জানায়। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সে ঝড় কেটে যায়। এ ভাবে ছোটখাটো ঝড় জলোচ্ছ্বাসের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা উপকূলের জেলেদের মাছ শিকার করতে গিয়ে হরেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঝড়ো হাওয়া কিছুক্ষণের মধ্যে থেমে গেলেও দু’দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বরের ঝড় ও সিডর-আইলার ঝড় থেমেছে অসংখ্য জেলেদের জীবন কেড়ে নিয়ে। এ সব ঝড়ে উপকূলের জেলেদের সবকিছু ওলোট-পালোট করে দিয়েছে। ঝড়ের কবলে পরে স্বজন-পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেকেই এখন নির্বাক। ঝড়ের ব্যাপারে সরকারি দপ্তরের বক্তব্য টর্নেডোর পূর্বাভাস দেয়া কখনো সম্ভব হয় না। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সামুদি্রক ঝড়টি ছিল টর্নোডে। তাই তারা পূর্বাভাস দিতে পারেননি। তবে সিডর, আইলা ও মহাসেন সম্পর্কে তারা আগেভাগেই সতর্ক সংকেত জারি করেছিলেন। জেলেরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, গভীর সমুদ্রে যারা সপ্তাহখানের জন্য ইলিশ শিকারে যান তারা এ পূর্বাভাস সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেন না। আবার অনেকে পূর্বাভাস পেলেও তীরে আসার সময় তখন থাকে না। তবে সুনামীসহ বেশ কয়েকটি সতর্ক সংকেত অনুযায়ী ঝড় আঘাত না হানায় জেলেরা কিছুটা আস্থা হারায় আবহাওয়া দপ্তরের উপর। তবে সিডর ও আইলায় ব্যাপক প্রাণহানি জেলেদের কিছুটা আস্থা ফিরেছে আবহাওয়া দপ্তরের উপর।