আগৈলঝাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে আলো ছড়াচ্ছে ‘আলোশিখা’

বরিশালের বিলাঞ্চল বলে খ্যাত আগৈলঝাড়া উপজেলা। ওই উপজেলার নিভৃত ও প্রত্যন্ত একটি গ্রামের নাম হচ্ছে রাজিহার। এক সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য নৌকা ছিলো একমাত্র ভরসা। গ্রামের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে নৌকায় করে তাকে সদরের হাসপাতালে নেয়ার পূর্বে অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করতেন। লেখাপড়া তা আবার কি! গ্রামের খেটেখাওয়া দিনমজুরেরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বিরক্তিকর মনে করতেন। তাই লেখাপড়া থেকে অকালেই ঝড়ে পড়তো ওইসব এলাকার শিশুরা।। ঝড়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য সেই কিশোর বয়সে (১৯৭৬ সনে) স্থানীয় কয়েকজন যুবককে নিয়ে নিজ বাড়িতেই পাঠশালা খোলেন ওই সময়ের দশম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র ও একাত্তরে পাক সেনাদের নির্মম বুলেটে নিহত শহীদ সামুয়েল হালদারের পুত্র জেমস্ মৃদুল হালদার। কালের বির্বতনে আজ অনেক কিছুই পাল্টে গেছে, উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমানের মনোরম পরিবেশে সাজানো-গোছানো আলোশিখা রাজিহার-এর প্রতিষ্ঠানগুলো দেখলেই যেকোন মানুষের মন কেড়ে নেয়। এখানে রয়েছে পাক সেনাদের নির্মম বুলেটে নিহত একই বাড়ির সাত শহীদের গণকবরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিশুদের বিনোদন ব্যবস্থা, রেস্ট হাউজ, হরিণের খামার ইত্যাদি। ১৯৭৬ সনের সেই পাঠশালা থেকে ১৯৭৮ সনে স্বেচ্ছাসেবী এনজিও আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। আলোশিকা এ যাবত্ আগৈলঝাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে ৪৫টি স্কুল। ওইসব স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষা নিচ্ছে প্রায় ১৭’শ শিক্ষার্থী। জেমস্ মৃদুল হালদার এলাকাবাসীর সু-চিকিত্সার কথা চিন্তা করে নিজ বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত করেন মারিয়া মাদার চাইল্ড ক্লিনিক। যেখানে এখন প্রতিনিয়ত চিকিত্সা সেবা নিচ্ছেন রাজিহার এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী অজপাড়াগাঁয়ের শত শত জনসাধারণ। শুধু এতেই থেমে থাকেনি তার (জেমস্ মৃদুল হালদারের) পথচলা। এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভোকেশনাল টেনিং সেন্টার। যার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন ওই এলাকার অসংখ্য বেকার যুবক-যুবতীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। এলাকার সচেতন মহলের মতে, বরিশালের বিলাঞ্চল বলে খ্যাত আগৈলঝাড়ার অজপাড়াগাঁয়ে আজ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী এনজিও আলোশিখা। এ আলোর জ্যোতি আজ আগৈলঝাড়ার সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, মাদারীপুর, রাজৈর, কালকিনি, উজিরপুর ও কুড়ালিয়া এলাকায়। শিক্ষা: স্বেচ্ছাসেবী এনজিও’র আলোশিখা রাজিহারের পরিচালক জেমস্ মৃদুল হালদার বলেন, গ্রামের ঝড়েপড়া শিশুদের পাঠদানে মনযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সনে আমি দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় গ্রামের কয়েকজন যুবকের সহযোগিতায় প্রথমে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করি। ওইসময় দাতা সংস্থা অক্সফাম বাংলাদেশ থেকে পাঠশালার জন্য সর্বপ্রথম ৮৯ হাজার টাকা অনুদান পেয়ে আমার উত্সাহ আরো বেড়ে যায়। পরবর্তীতে এসএসসি. এইচ.এস.সি ও বিএ পাস করি। লেখাপড়ার পাশাপাশি ১৯৭৮ সনে অবহেলিত এলাকায় আলো ছড়াতে (সমাজ উন্নয়নের জন্য) কর্মকান্ড আরো বাড়াতে থাকি। প্রতিষ্ঠা করি আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র নামের একটি সংগঠন। একই সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করতে থাকি বিভিন্ন দাতা সংস্থার সাথে। নিজের উত্সাহ ও দাতা সংস্থার সাহায্যে বর্তমানে আলোশিখার অধীনে আগৈলঝাড়ার গৈলায় একটি, রাজিহারে একটি ও উজিরপুরের সাতলায় একটি কিন্ডার গার্টেন; আগৈলঝাড়ার বিভিন্ন গ্রামে ৯ টি, কোটালীপাড়ায় ১৩ টি, উজিরপুরে ১৪ টি, কালকিনিতে ২ টি, রাজৈরে ৩ টি, ডিমচর এলাকায় ১টিসহ ৪৫টি স্কুলে শিক্ষাদানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ওইসব স্কুলে বর্তমানে প্রায় ১৭’শ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পাঠদান করানো হচ্ছে। এছাড়াও গ্রামের বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ২০১০ সনে প্রতিষ্ঠা করা হয় এসএসসি ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার। সম্পূর্ণ বিনা বেতনের এ প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি লাভ করে। অষ্টম শ্রেণী পাস শিক্ষার্থীদের ভর্তির মাধ্যমে নবম ও দশম শ্রেণীর সেন্টারে বর্তমানে তিনটি ট্রেডে ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও গার্মেন্ট এন্ড টেইলারিং-এর অনুমোদন পেলেও ওয়েলডিং ট্রেডটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিটি ট্রেডে ৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষিত শিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। ইতোমধ্যে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে পেয়েছে। এখানে রয়েছে দূর-দূরান্তেরর শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা। এভাবেই সেই সংগঠনটি এনজিওতে রূপ নেয়। স্বাস্থ্য: “শিশুমৃত্যুর হার কমানো ও নিরাপদ মাতৃত্ব রক্ষা”-শ্লোগানকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে আলোশিখা রাজিহারের পরিচালিত মারিয়া মাদার চাইল্ড ক্লিনিকের কার্যক্রম। এনজিও’র চেয়ারম্যান মার্থা হালদার জানান, আলোশিখার স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে শিশুমৃত্যুর হার কমানো ও নিরাপত্তা মাতৃত্ব রক্ষায় ৩০ জন স্বাস্থ্যকর্মী সর্বদা প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ঘুরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গর্ভবতী মায়েদের সেবা ও যত্নের পাশাপাশি তাদের খোঁজখবর এবং ভূমিষ্ঠ শিশুদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন। তিনি আরো জানান, সরকারি অনুমোদনকৃত ১০ বেডের মারিয়া মাদার চাইল্ড ক্লিনিকে দু’জন মেডিকেল অফিসার ও চারজন সিনিয়র স্টাফ নার্স সর্বদা ক্লিনিকে ভর্তি এবং আগত মা ও শিশুদের সেবা দিয়ে আসছেন।