বরিশালের জলদস্যুরা আইলার চেয়েও ভয়ংকর

আইলা, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও জেলেদের কাছে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি হচ্ছে জলদস্যু। মেহেন্দীগঞ্জের ভাষানচর জেলে পল্লীর বাসিন্দা বজলুর রহমান জানায়, ঝড়-বন্যায় তবুও আলামত পাওয়া যায়, ডাকাতের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। হঠাত্ এসে এরা কেড়ে নেয় জেলেদের সর্বস্ব। মত্স্য শিকারে যাবার পর স্বামীর চিন্তায় ঘুমায় না বজলুর স্ত্রী আজিমোন নেছা। আকাশে মেঘ নেই, গাঙ্গে বানের কিংবা তুফানের আলামত নেই। তবুও তার উত্কণ্ঠা। না জানি কখন হানা দেয়ে জলদস্যু। কেড়ে নেয় তাদের সবকিছু। জাল-বৈঠা নিয়ে ক্ষান্ত হবে তো! নাকি তার স্বামীকে মারধর করে গাঙ্গে ফেলে দেবে। এ চিন্তা শুধু আজিমোনের নয়, উপকূলের জেলে পরিবারের সকল বধূর। কারণ মেঘনা নদী থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারীদের পাশাপাশি ঘুরে বেড়ায় একদল হায়না। এ হিংস্র দানদের জেলেরা জলদস্যু কিংবা ডাকাত নামেই চেনে। জেলেদের সাথে আলাপ করে জানা যায় বঙ্গোপসাগর ও তত্সংলগ্ন নদীগুলোতে নৌ ডাকাতির সাথে জড়িতরা অধিকাংশই থাকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে। আরো বেশ কয়েকটি গ্রুপ থাকে লক্ষীপুর, মনপুরা ও চরফ্যাশনের দূরবর্তী কালকিনি এলাকায়। অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে এরা নৌ পথে চলাচল করে। জেলেদের জাল, নৌকা এমনকি শিকার করা ইলিশ ও ট্রলারের ইঞ্জিন পর্যন্ত এরা খুলে নিয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামপ্রতিককালে ডাকাতির পরিবর্তে উপকূলের জলদস্যুরা সোমালিয়ার জলদস্যুদের মত জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে। জলদস্যুদের কাছ থেকে টোকেন ক্রয় করে জেলেদের নদী বা সাগরে জাল ফেলতে হয়। নির্দিষ্ট অংকের টাকায় এ টোকেন ক্রয় করেও রক্ষা নেই। অসংখ্য গ্রুপ টোকেন বিক্রি করে। এক গ্রুপের টোকেন ক্রয় করে মাছ শিকারে গিয়ে অন্য গ্রুপের হাতে পড়লে আর রক্ষা নেই। ফের অপহরণ এবং মুক্তিপণ। তখন আর ক্রয়কৃত টোকেন কোন উপকারে আসে না। কষ্টের সাথে নিবিড় আলিঙ্গন সাগর কিংবা উপকূলের নদীতে এখন আর আগের মত জেলে নৌকার বহর দেখা যায় না। জেলেপাড়ায় চলছে দুর্দিন। মহাজনের দাদনের টাকা ও এনজিওদের চড়া সুদের ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেক জেলে। হিজলার বেড়ি বাঁধের উপর কথা হয় আব্দুর রশিদ মাঝির সাথে। বয়সের ভারে কাবু হয়ে গেছেন। বয়স তাকে পীড়া দিলেও শরীরের অবাধ্য হয়ে সে নিত্য মাছ শিকারের সাথে যুক্ত হচ্ছে। চোখেমুখে হতাশার ক্লান্তি আর দুর্ভোগের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালেন ইলিশের সেই দিন আর নেই বাবা। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পড়ত। ৫/৬ জনে মিলে জাল টেনে নৌকায় তোলা হতো। দিন শেষে গাঙ্গ পাড়ের চায়ের দোকানের আড্ডাটা ছিল জমজমাট। রশিদ উদাস দৃষ্টিতে বলতে লাগলেন সেই দিন কোথায় গেল? বাপের লগে গাঙ্গে যাইয়া কত খুশী হইতাম। ‘মাছে মাছে নাওডা ভইর্যা যাইত। হেই সময় গাঙ্গে পানি আর মাছ আছিল হমান’। এখন আর গাঙ্গে (নদীতে) আগের মত মাছ নেই। তার উপরে একের পর এক প্রাকৃতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, যেন আসমানী বালার মত গজব নেমে আসছে জেলেপাড়াগুলোতে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কেড়ে নেয় জেলে পরিবারগুলোর সর্বস্ব।