একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থা :উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বিষয় কাঠামো
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৩, ২১:২৯
আমরা ২০২১ এর ভিশন বাস্তবায়ন সামনে নিয়ে এগিয়ে চলছি। এর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষত ডিজিটাল ক্লাসরুম, সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাস গ্রহণ করা। এ লক্ষ্যে সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের পাঠ্যসূচি ও পদ্ধতির সাথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্ হোঁচট খাওয়ার মতোই একটি বিষয় তা হলো আমাদের দেশের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কাঙ্ক্ষিত বিষয় কাঠামো। বহু আলোচনার পর প্রকাশিত বিষয় কাঠামো দেখে খানিকটা বিস্মিত হতে হয়। এখানে বিভিন্ন শাখায় ভর্তি হবার কথা থাকলেও মূলত শাখা বলতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার কথা বোঝায়।
বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিষয় কাঠামো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি বিষয় উল্লেখিত বিভাগের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে করা হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে পদার্থ, রসায়নকে মূল রেখে গণিত অথবা জীববিজ্ঞানকে ঐচ্ছিক বিষয় রাখা হয়েছে। তার মধ্যে যে কোন ১টি নিতে হবে এবং ৪র্থ বিষয় হিসেবে উল্লেখিত বিষয় দুটি ছাড়াও অন্যান্য বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে বিজ্ঞান বিভাগের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকছে। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের মূল বিষয় হিসেবে থাকছে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা এবং হিসাববিজ্ঞান, যা উল্লেখিত বিভাগের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে অতীব জরুরি।
অপরদিকে মানবিক বিভাগের বিষয় কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। আবশ্যিক ৩টি বিষয় বিন্যাস হয়েছে নিম্নোক্তভাবে— ইতিহাস, অথবা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি পৌরনীতি ও সুশাসন, অথবা অর্থনীতি, অথবা যুক্তিবিদ্যা সমাজবিজ্ঞান, অথবা সমাজকর্ম, অথবা ভূগোল;
উক্ত বিন্যাসে ইতিহাস অথবা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এর মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ১টি বিষয় পড়তেই হবে। আমাদের সরকারি এবং বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইতিহাস বিভাগ নেই বললেই চলে, রাতারাতি একটি বিভাগ খোলাও সম্ভব নয়। ফলে শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়টি পড়বে। যেমন আমার কলেজে ইতিহাস বিভাগ না থাকায় মানবিক বিভাগে ভর্তিকৃত সকল শিক্ষার্থী ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়টি পড়তে বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর শিক্ষার্থীরা কি করবে? বলা চলে বিশ্বায়নের এ সময়ে প্রয়োজন একটি অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা কাঠামো।
বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিকে যতটা মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন ঠিক ততোটাই প্রয়োজন নিজের দেশ, দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং বর্তমান প্রজন্মকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সে বিষয়কে সামনে রেখেই পৌরনীতি ও সুশাসন এবং অর্থনীতি বিষয় ২টি পৃথক ক্যাটাগরিতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাকে পুঁজি করে শুরু হয় উচ্চতর শিক্ষা । উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্রে একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং কলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়টিকে বিষয় নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখানো হয়। তাছাড়া যে বিভাগেই ভর্তি হোক না কেন নন-মেজর হিসেবে বিষয়টি প্রাধান্য পায় (এমনকি বুয়েট এর মতো শিক্ষা ক্ষেত্রের বিভিন্ন বিভাগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়টি পড়ানো হয়, যা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌরনীতি ও সুশাসন নামে পরিচিত)। অর্থাত্ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেই প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীকেই বিষয়টি পাঠ করতে হয়। এবার আসা যাক কর্মক্ষেত্রে, সরকারি চাকরি সবারই কাম্য। বিসিএস-সহ পিএসসি কর্তৃক আয়োজিত সকল পরীক্ষায় উল্লেখিত বিষয়ের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব লক্ষ্য করা যায়। পরীক্ষাগুলোতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত এই বিষয়গুলোর সাথে সমান তালে অংশগ্রহণ করে পৌরনীতি ও সুশাসন সর্ম্পকিত পাঠ্যসূচি। উল্লেখিত বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষায় ৩০০ নম্বর শুধুমাত্র এই বিষয় কেন্দ্রিক হয়ে থাকে।
আমাদের দেশের নানাবিধ জাতীয় সমস্যার সাথে ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি নতুন সমস্যা, তা হলো সুনাগরিক না হওয়ার সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষা জীবনের অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে এসেও কোন কোন শিক্ষার্থী আইন সভার নাম জানে না। দেশের সরকার পদ্ধতি, রাজনৈতিক দল, জাতীয় নেতৃবৃন্দের অবদান, জাতীয় দিবসসমূহের গুরুত,্ব সর্বোপরি নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য সর্ম্পকেও কোন জ্ঞান থাকে না। অর্থাত্ জাতি হিসেবে আমরা নিজ দেশ, দেশীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে খানিকটা উদাসীন। কাজেই বর্তমানের বিষয় কাঠামোয় সকল নাগরিকের শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের মতো পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়টিকে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা অতীব জরুরি এবং আমাদের জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলার জন্য পাঠ্যসূচির মাধ্যমে শিক্ষা প্রবর্তন করা দরকার।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ,ঢাকা