[ রা জ নী তি ]

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গতিশীলতার প্রয়োজনে:দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না

সংসদ বর্জনের অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ করতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল শেষ চেষ্টা হিসেবে আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। টিআইবি তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছে যে, দেশের রাজনীতিতে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, উভয় দলই ধারাবাহিকভাবে সংসদ বর্জনের অনুশীলন করে চলেছে। ইতিমধ্যে ২০১৩-১৪ সালের জন্য নতুন বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা তাদের বিভিন্ন ধরনের মতামত দিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের বাইরে কারও পক্ষেই বাজেট নিয়ে তেমন আশাবাদ ব্যক্ত করতে দেখা যাচ্ছে না। অবাস্তব এবং ফাঁকি-ঝুঁকির বাজেট হিসেবেই নতুন বাজেটকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মূল সমস্যা যে রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সে কথাই আমাকে বলতে হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মানুষের দেহের মাথার সাথে তুলনা করা চলে। রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব সঠিক না হলে, যোগ্য ও দায়িত্বশীল না হলে, বিপর্যয় আসবে চারিদিক থেকে। তাই সরকার পরিচালনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের পেতে হবে। শুধু আমলাতান্ত্রিক নিয়মে একটি বাজেট দিলেই হবে না। বাজেটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতার যে সকল প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে তার কোন সদুত্তর না খুঁজে জনগণকে নির্বাচনের কথা শোনানো হচ্ছে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই যে নির্বাচন হবে সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের দৃঢ়তা প্রকাশ করা হচ্ছে বারে বারে। জনসেবার সুশাসন অগ্রাহ্য করে শুধু নির্বাচন করে ক্ষমতা দখলের চিন্তা বিরোধী দলের, জোটেরও। মোট কথা, সত্ ও যোগ্য সরকার আসার প্রয়োজনীয়তা দলীয় রাজনীতির বিবেচ্য কোন বিষয় নয়। প্রধান দলগুলোর সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে যোগদান করা থেকে বিরত থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখে চলেছেন তার বিরুদ্ধে আমিও বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বলার চেষ্টা করেছি। সংসদে না গিয়ে বিরোধী সদস্যদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা চরম অনৈতিক আচরণ, যার সমালোচনা আরও অনেকেই করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য আওয়ামী লীগের ছিল সংগ্রামী ঐতিহ্য। কিন্তু ঐতিহ্য থাকলে কি হবে, দলটি সংসদ বর্জন এবং সংসদে গণতন্ত্রের অনুকূলে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করতে অস্বীকার করে যে নজির স্থাপন করেছে সেটা বড়ই হতাশাব্যঞ্জক। উপরন্তু তারাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করার অশুভ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং মানিক মিয়া তাঁর লেখনীর দ্বারা দলটির অনুসারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে এমন সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করার ব্যাপারে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বিপরীতটাই এখন সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বহিরাগতদের প্রভাবে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এমন রাজনীতি শুরু করে যা বিপ্লবী কোন দলের রাজনীতির তুলনায়ও বেশি বিপ্লবী। আওয়ামী লীগের বিপ্লবী রাজনীতিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অচলাবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী। একযোগে সংসদ বর্জনের অগণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সৃষ্টির ব্যাপারে টিআইবি সঠিকভাবেই আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিএনপি বিরোধী অবস্থানে থাকতে সংসদকে উপেক্ষা করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের দৃষ্টান্ত অনুকরণ করার মধ্যে কোন দোষ খুঁজে পায়নি। সাড়া জাগানো টিআইবি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংসদের ৩৭০ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ৫৪ দিন বিরোধী সদস্যরা সংসদে উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান সংসদের প্রথম ও পঞ্চদশ অধিবেশনের মাঝখানে কোরাম পুরো না হওয়ায় মোট ১৭২ ঘন্টা অপচয় হয়েছে এবং টাকার অংকে দেশের ক্ষতির পরিমাণ ৫৯ কোটি টাকা। একে কেবল দেশের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে, ব্যাপারটিকে দেখতে হবে একটি ন্যায্য ও সত্ সরকার গঠনে সরকার দলীয় সদস্যদের আন্তরিক প্রয়াসের অভাব হিসেবে। জাতি হিসেবে আমরা এত অন্ধ নই যে, গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা কিভাবে ব্যাহত করা হচ্ছে তা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাবে। গণতন্ত্রের গতিধারাকে থামিয়ে দেবার যখন চেষ্টা চলছে তখন গণতন্ত্রের সাফল্যের ব্যাপারে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি দাবি করে সমগ্র জাতিকে ধোঁকা দেবার সুযোগ নেই। আইনজীবী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী সোচ্চার গ্রুপ আজ রাজনীতিকরণের শিকার বলেই টিআইবি এই সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, গণতন্ত্রকে সক্রিয় দেখতে চাইলে সংসদ বর্জনের অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ করতে হবে। দলীয়করণের রাজনীতির নিকট জিম্মি না হলে সুশীল সমাজের সদস্যরাই, বিশেষ করে আইনজীবী ও সাংবাদিকরা সংসদ বর্জনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন। সরকার পরিচালনায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির উপর নির্ভর না করে পুলিশী ক্ষমতার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় পুলিশ প্রশাসনেও অরাজকতা বেড়ে চলেছে। পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিতে না পারায় রাজধানীতেই কিছুদিন পূর্বে দুই তরুণ ব্যবসায়ীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের আইন হাতে তুলে নেয়ার এত বড় দুঃসাহস একদিনে তৈরি হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের পদে পদে ঘুষ দিতে হয়। যে জন্য তাদেরকে দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হচ্ছে। দেশে যে পুলিশের নির্যাতন বাণিজ্য চলছে তা কারও অজানা নয়। আমরাই পুলিশকে অপকর্ম করতে সাহায্য করছি। কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তদন্তের জন্য পুলিশ রিমান্ডে পাঠানো কিছুতেই সুবিচারের কথা হতে পারে না। তবুও আদালত সহজেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের রিমান্ডে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেন যে বাধ্য হচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। এভাবে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে পুলিশী ক্ষমতার অপপ্রয়োগে ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে দিয়ে পুলিশের জন্য দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের উচিত হবে বিষয়টি উদ্ঘাটিত করার জন্য নিরীক্ষা করে দেখা যে, কিভাবে দলীয়করণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালিয়ে ভেতর হতে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করে দলীয়তন্ত্রের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। আমরা আইনজীবী হিসেবে, সাংবাদিক হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে পারছি না, কারণ, আমরা ব্যক্তিস্বার্থে দলীয়তন্ত্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছি। দলীয়করণের নীতি মেনে নিয়ে দলীয় এক্টিভিস্ট হওয়ার কারণে আইনজীবীকে, সাংবাদিককে দলের জন্য যা ভাল সেই নির্দেশনা মানতে হচ্ছে, গণতন্ত্রের জন্য যা করণীয় তা করা সম্ভব হচ্ছে না। দলীয় রাজনীতি অগণতান্ত্রিক হওয়ায় আইনজীবী, সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী গ্রুপের সদস্যরা দলীয় এক্টিভিস্ট হিসেবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে প্রত্যাশিত স্বাধীন ও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছেন না। গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠানই অর্থাত্ বিচার বিভাগ এবং সংবাদপত্র নিজস্ব স্বাধীনতার প্রশ্নে খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি শেষ হওয়া অবশ্যই দরকার। এ দাবি টিআইবি সমর্থন করেছে। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে গণতন্ত্র বিধ্বংসী সংস্কৃতির বিরোধিতা গণতন্ত্রকামী সকলকেই করতে হবে। টিআইবি তাই সংসদ সদস্যদের সংসদ বর্জনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের পক্ষপাতী। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের অনুসৃত সংসদ বর্জনের পথ পরিত্যাগ না করে তাহলে তাদেরকে নিশ্চয়ই চাপে রাখতে এবং সংসদকে কার্যকর করার স্বার্থে একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে। আর সেই সুপারিশ আসতে হবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। এটাই আমার সুচিন্তিত অভিমত। নির্বাচন কমিশনকে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা উপলব্ধি করতে হবে। নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জনের কথা বিস্মৃত হয়ে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব হতে পারে না। যদি গণতন্ত্র কাজ করতে না পারে তাহলে কার নেতৃত্বে এবং কিভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো সেটা জনগণের নিকট মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের অধীনে গঠিত নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্র বিরোধী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়ক হতে পারে না। এটাও আমার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে জোরালোভাবে সুপারিশ করতে চাই যে, নির্বাচন কমিশনকে আরও একটি আইনের অনুকূলে পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। কেউ দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। রাজনৈতিক দলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার সুযোগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র কাজ করবে এমনটি ভাবা যে অবাস্তব তা তো প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে যে ধরনের দলীয় নেতৃত্ব চলে আসছে তাকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলা যায় না। দলীয় নেতৃত্বে রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব গ্রহণের বা উহা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হচ্ছে না। দলীয় নেতৃত্বে যেহেতু কোন চ্যালেঞ্জ নেই সেহেতু শাসন ব্যবস্থার উন্নতিরও কোন আশা দেখছি না। জাতি একের পর এক ব্যর্থ সরকারের ব্যর্থতায় ভুগছে। নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে যাদের আগ্রহ নেই তারা আর যাই হোক রাজনীতিবিদ নন। রাজনীতি নেতৃত্বের জন্য—ব্যবসা করা বা চাকরির জন্য নয়। লেখক :আইনজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা