মেয়র পদ এখন ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ দখলে নিতে সচেষ্ট দুই দল

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) মেয়র পদটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের নিকট এখন ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হিসাবে দেখা দিয়েছে। সে কারণে মেয়র পদটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ১৪ দল ও ১৮ দলীয় জোট। সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী ও সদ্য সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের প্রচার-প্রচারণায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা আগেভাগে মাঠে নেমে পড়লেও অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে শেষ মুহূর্তে আড়মোড়া ভেঙ্গে ১৮ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে নেমেছেন। ইতিমধ্যে খুলনায় পৌঁছে বিএনপিসহ ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। সেইসাথে তারা স্থানীয় ও বাগেরহাট জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এছাড়া অভিমান ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মাঠে নামার কারণে প্রচার-প্রচারণায় জোয়ার এসেছে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির আনারস প্রতীকের। অন্যদিকে সমানতালে তালুকদার আব্দুল খালেকের সমর্থনে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা। মেয়র পদটি দখলে নিতে তাই ঘুম হারাম হয়ে গেছে দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের। কেসিসির মেয়র পদটি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দখলে ছিল বিএনপির। ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে পরপর দুইটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শেখ তৈয়েবুর রহমানের নিকট আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের ধাক্কায় শেখ তৈয়েবুর রহমান মেয়র পদ থেকে ছিটকে পড়েন। তার জায়গায় দায়িত্ব দেয়া হয় তখনকার মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিকে। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে তিনি প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক প্রায় ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে মনিরুজ্জামান মনিকে পরাজিত করে ‘মেয়র’ পদটি দখল করেন। তবে ওই নির্বাচনে মনি স্থানীয় বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীকে পাশে পাননি। গত ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নগরীর সার্কিট হাউসের জনসভায় কেসিসির মেয়র প্রার্থী হিসাবে আবারো তালুকদার আব্দুল খালেকের নাম ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরই নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েন তিনি। পাশাপাশি নির্বাচনী কৌশলও ঠিক করেন ঠাণ্ডা মাথায়। গত ১১ মে বিএনপির সাবেক নেতা ও সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এনায়েত আলীকে তার নির্বাচনের জন্য গঠন করা অরাজনৈতিক সংগঠন ‘সম্মিলিত নাগরিক কমিটি’র চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব দিয়ে প্রতিপক্ষকে প্রথম চমক দেখান। তাছাড়া যে মুহূর্তে বিএনপিসহ ১৮ দলের নেতারা কেসিসির মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা নিয়ে ছিলেন দ্বিধা-বিভক্ত সেই সময় তালুকদার আব্দুল খালেক ফুরফুরে মেজাজে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক ও গণসংযোগে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর চেয়ে তিনি ছিলেন অনেকখানি এগিয়ে। এছাড়া নগরীর পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগকালে তিনি ভোটারদের সামনে রাস্তাঘাটের সংস্কারসহ তুলে ধরছেন গত পাঁচ বছরে তার করা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নির্বাচিত হতে পারলে তিনি আগামী তিন বছরের মধ্যে তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন। ইতিমধ্যে তার সমর্থনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বিমল বিশ্বাস ও ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা খুলনায় গণসংযোগ করে গেছেন। এছাড়া গত কয়েকদিন ধরে তালুকদার আব্দুল খালেকের পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ করছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক অসিত বরণ বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় যুবলীগের কৃষি সম্পাদক আনোয়ার হোসেন ও সহ-কৃষি সম্পাদক রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাছাড়া খালেকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে আজ মঙ্গলবার যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হকের নেতৃত্বে ৬৪ জনের একটি বিশাল টিম ও আগামীকাল বুধবার খুলনায় আসছেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আমীর হোসেন আমু এমপি ও তোফায়েল আহমদ এমপি। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের এই শীর্ষ নেতারা খালেকের পক্ষে নগরীতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণাসহ পথসভায় খালেকের করা উন্নয়ন নগরবাসীর সামনে তুলে ধরবেন। অপরদিকে, খুলনায় পৌঁছে গত দুইদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও এক সময়ের খুলনার ছাত্র রাজনীতির অন্যতম নেতা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান, সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি শফিউল আলম প্রধানসহ ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রচারণাকালে বিএনপি নেতারা সরকারের গত সাড়ে চার বছরের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরছেন। ভোটাররা বলছেন, দুই মেয়র প্রার্থীর পক্ষে দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের মাঠে নামার কারণে ‘মেয়র’ পদটি এখন তাদের জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইসাথে ‘ভোট’ উত্সবের নগরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা।