না হইলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিবে না

ক্রমেই খারাপ হইতেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির চিত্র। এইসব ব্যাংকের ভবিষ্যত্ কি হইবে তাহা লইয়া এখন সকলেই সন্দিহান। অথচ ব্যাংকিং খাত সংস্কারের আওতায় ইতোপূর্বে নানান উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছিল। ব্যাংকগুলিকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হইয়াছিল। কোম্পানিতে রূপান্তরের আগে ব্যাংকগুলির মান উন্নয়নের জন্য নিয়োগ দেওয়া হইয়াছিল বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও। তাহার পরও ব্যাংকগুলির পরিস্থিতির উন্নতি হয় নাই। বরং দেখা গিয়াছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিতে বাড়িয়াছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের অঙ্ক। পাশাপাশি নানান অনিয়ম আর জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হইয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতেও সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় নাই। পরিচালনা পরিষদ সদস্য নিয়োগেও যথাযোগ্য লোককে বাছাই করা যায় নাই। যাহার ফল হিসাবে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ নানা কেলেংকারির ঘটনা জাতি প্রত্যক্ষ করিয়াছে। ইহার পরও নীতি নির্ধারকদের টনক নড়ে নাই। বরং রাজনৈতিক প্রভাব বলয় বাড়িয়াছে। ব্যাংক পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব অতীতেও ছিল। একই ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হইয়াছে। বিষয়টি নিয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সরকারকে সতর্ক করিয়াছে। এখন প্রশ্ন হইতেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির এই হতাশাজনক পরিস্থিতির উন্নতি কি আদৌ হইবে না? আইএমএফ সরকারকে বলিয়াছে ওইসব ব্যাংকে মূলধন যোগানের জন্য। কিন্তু আর কতকাল এই সব ব্যাংককে সরকার মূলধন যোগাইয়া যাইবে? অতীতে বহুবার সরকার এই ব্যাংকগুলিকে অর্থ যোগান দিয়াছিল। তাহাতে কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। খবর প্রকাশিত হইয়াছে যে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়াছে। একই সঙ্গে বাড়িয়াছে নন-পারফর্মিং লোনও। রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক অর্থ্যাত্ সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের নন-পারফর্মিং ঋণ বাড়িয়া গড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছাইয়াছে। ইহাছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তিনটি ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ সংরক্ষণে ব্যর্থ হইয়াছে। ব্যাংকগুলির এই খারাপ অবস্থার কারণে দেশের রাজস্ব ও আর্থিক খাত ঝুঁকিতে পড়িয়াছে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছে আইএমএফ। একই সঙ্গে বলিয়াছে, ঋণ বিতরণে সামগ্রিক বিচক্ষণতাসহ মন্দ ঋণ আদায়ে আগ্রাসী হইতে হইবে। কঠোরভাবে মানিয়া চলিতে হইবে সমঝোতা স্মারক। এইখানে বলিয়া রাখা ভাল যে, এই ব্যাংকগুলির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করিয়াছে। যাহাতে বেশকিছু নিয়ম-কানুন রহিয়াছে এবং তাহা মানিয়া চলিবার জন্য ব্যাংকগুলি অঙ্গীকারাবদ্ধ। আইএমএফের কথা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলি তাহা সঠিকভাবে মানিয়া চলে নাই। ঋণ বিতরণেও গাফিলতি কিংবা অনিয়ম করিয়াছে। সেই কারণে আইএমএফ ব্যাংকগুলিতে শুধু পুনঅর্থায়নের কথাই বলে নাই, বরং কঠোর তদারকির কথাও বলিয়াছে। এখানে উল্লেখ করিতে হয় যে, সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করিয়াছে। তাহাতে কিছু প্রতিশ্রুতিও দিয়াছে। আইএমএফকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, চলতি বত্সরের জুনের ভিত্তিতে চার ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা রহিয়াছে। ইহাতে ব্যাংকের সম্পদ মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে। আইএমএফ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উন্নয়নে চার ব্যাংককে জিডিপির দেড় শতাংশ পুনরায় মূলধন হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করিয়াছে। এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়া প্রশ্ন উঠিতে পারে। বৃহত্ এই চার ব্যাংককে ‘স্পুন ফিডিং’ আর কত করিবে সরকার। জনগণের আমানতের টাকা কিংবা করের টাকা এইভাবে নষ্ট হইতে দেওয়া যায় না। বরং সরকারের উচিত হইবে ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পরিষদে দক্ষদের নিয়োগ দেওয়া। যাহারা কোন গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করিবে না কিংবা যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ প্রদান করিবে না। পরিচালনা পরিষদ সদস্যদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও থাকিতে হইবে। না হইলে যতই মূলধন যোগান দেওয়া হউক না কেন,পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিবে না।