জীবনের পরিমিতি

মানুষ স্বপ্ন দেখে। তাই তার মনে আশা জাগে। আশার পেছনে থাকে লোভ। আশা এবং লোভের প্রবল স্রোতে মানুষের বুদ্ধি-বিবেক অনেক সময় দাঁড়াতেই পারে না। জীবনে বেঁচে থাকার আশা, সম্পদের আশা, নেতৃত্বের আশা, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার আশা, আজীবন ক্ষমতায় থাকার আশা, সুখে থাকার আশা, সুস্থ থাকার আশা, ভালোবাসা পাওয়ার আশা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত মানুষের মনে তোলপাড় করছে, ঘুরপাক খাচ্ছে। সীমাহীন আশার সাগরে ভেসে, সময়ের তরী বেয়ে সম্মুখে ধেয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন। বাস্তবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিত্সা—এই চারটি চাহিদা পূরণ হলেই একজন সাধারণ মানুষের জীবনধারণে কোন সমস্যা থাকে না। এরপর আনন্দ উপভোগ করার সামর্থ্য যুক্ত হলে উচ্চবিত্তের জীবন ভালোভাবেই কেটে যায়। তারপরও অতৃপ্ত থাকে মানুষের আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষা নামক দুর্বার প্রবৃত্তি নিয়েই মানুষের জন্ম। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর আকাঙ্ক্ষা আছে কিনা জানা যায় না। গরু যখন চোখ বন্ধ করে মনের সুখে জাবর কাটে, কুকুর যখন জিহ্বা বের করে একমনে হাঁফাতে থাকে, কুমীর যখন চোখ বন্ধ করে শরীরে রোদ লাগায় কিংবা শকুন যখন তাল গাছের উপরিভাগে বসে থাকে, তখন তারা কোন স্বপ্ন দেখে কিনা, জানি না। তবে মনুষ্যজাতি নিরন্তর স্বপ্নের জাল বুনে যায়। মানুষের স্বপ্নের বিষয় অফুরন্ত এবং যুগে যুগে নতুন নতুন স্বপ্ন যুক্ত হয়। মানুষের স্বপ্নে কালের কোন পরিধি নেই। সে অনন্তকালের স্বপ্ন দেখতে পারে। সে বেঁচে থাকতে চায় সন্তানের মাধ্যমে, বংশধরদের মাধ্যমে। তাই সে গড়ে তোলে সম্পদের ভাণ্ডার, বাড়িয়ে যায় সম্পত্তির প্রসার। নিজের নাম, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি ও বংশধারা সে সঞ্চারিত করে রেখে যেতে চায় অনাদিকাল পর্যন্ত। তাই সে সম্পদ আহরণ করে। অঢেল সম্পদকে সে স্বাধীনতা ও ক্ষমতার রক্ষাকবচ হিসাবে চিন্তা করে। Leo Tolstoy-এর How much Land does a man need গল্পের কাহিনীটি এখানে স্মরণ করা যেতে পারে : শহরে বসবাসকারী বড় বোন একদিন ছোট বোনের গ্রামের বাড়িতে আসে। ছোট বোনের স্বামী পাহুম (Pahom) সাধারণ কৃষি খামারের মালিক। বড় বোনের মতে শহরের লোকেরা ভালো কাপড়-চোপড়, খাবার, পানীয়, সিনেমা, নাটক ইত্যাদি আমোদ-প্রমোদের মধ্যে থাকে। ছোট বোনের মতে গ্রামের কৃষকের জীবন সাদামাটা , রুক্ষ হলেও তারা নিজের জমিনে স্বাধীন ও মুক্ত জীবনযাপন করে। তাদের খাওয়া-পরার কোন অভাব নেই এবং শহরের লোকদের মতো তারা শয়তানি কাজে জড়িত হবার সুযোগ পায় না। এমন সময় ছোট বোনের স্বামী পাহুম ঘরে ঢুকে বললো, তাদের সুখী হবার পথে একটাই সমস্যা আর তা হলো পর্যাপ্ত জমিন না থাকা। সদর্পে সে বললো, অনেক জমিন থাকলে সে কেবল মানুষ নয়, শয়তানকেও পরোয়া করবে না। কয়েকদিন পর শোনা গেল পার্শ্ববর্তী এক গ্রামের মহিলা জমিদার তার সম্পত্তি বিক্রি করে দেবে। গ্রামের চাষিরা যার যেমন সাধ্য জমিন ক্রয় করতে গেল। পাহুম নিজেও বেশ কিছু জমি কিনে নিল। কিছু পতিত জমি বিক্রি করে পাহুম তার সকল ঋণ পরিশোধ করে অধিকতর আরামের সাথে জীবনযাপন করতে থাকলো। এই অবস্থায় পাহুম তার জমি নিয়ে বেশ কর্তৃত্বপরায়ণ ও গর্বিত হয়ে উঠলো। পড়শীদের গৃহপালিত প্রাণী তার জমিনে এলেই সে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হতে থাকলো। প্রতিবেশীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবার হুমকি দিল। এ অবস্থায় সে অধিকতর বড় একটি এলাকায় অন্য কমিউনে চলে এল। এখানে সে অনেক জমিন চাষ করে প্রচুর ফসল ফলাতে পারে। তবে তার একটাই দুঃখ যে, এখানে তাকে অন্যের জমিন লিজ নিয়ে চাষ করতে হচ্ছে। এখানে অনেক উর্বর জমিন কেনা-বেচা করে সে বেশ টাকার মালিক হবার পর একদিন দূরবর্তী অঞ্চলে বাশকিরদের (Bashkirs) সাথে যোগাযোগ ও পরিচয় হয়। তাদের অনেক পতিত জমিন আছে। বাশকিররা তখন স্বাধীন জাতি হিসাবে উরাল পর্বতের উভয় পাদদেশে ভলগা (Volga), কামা (Kama), তবল (Tabol) এবং আইক (Yaik) নদীর উজানে বসবাস করে। অল্প দামে অনেক বেশি জমিন কেনার আশায় পাহুম বাশকিরদের সাথে আলোচনা করতে গেল। তাদের চাহিদা ছিল খুবই অস্বাভাবিক ধরনের। মাত্র ১০০০ রুবেল জমা দিয়ে পাহুম সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতটুকু জমিনের উপর দিয়ে চক্রাকারে হেঁটে আসবে চক্রের ভিতরের সবটুকুই তার হয়ে যাবে। তবে যে স্থান থেকে শুরু করা হবে সেখানেই তাকে সূর্যাস্তের পূর্বে ফিরে আসতে হবে। ব্যর্থ হলে সে জমিন তো পাবেই না, বরং জমা দেয়া ১০০০ রুবেলও বাজেয়াপ্ত হবে। পাহুম সাহস ও আনন্দের সাথে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলো। তার ধারণা, এই পদ্ধতিতে সে অনায়াসেই বিশাল একটি এলাকা বৃত্তাবদ্ধ করে অনেক সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে। রাতে পাহুম একটি অতিপ্রাকৃত স্বপ্ন দেখে। শয়তান তার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে আর তার মৃতদেহটা শয়তানের পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে। পরদিন প্রত্যুষে চুক্তি অনুযায়ী সে গাঁইতি হাতে কিছুদূর পরপর চিহ্ন দিয়ে বিশাল জমিন দখলে এগিয়ে যায়। যথাসম্ভব সে বৃত্তের আয়তন বাড়িয়ে যেতে থাকলো। সূর্য ঢলে পড়লে পাহুমের ফেরার কথা মনে পড়লো। সে অনেক দূর এসে গেছে। এবার তাকে বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে যাত্রাস্থলে ফিরে যেতে হবে। বৃত্ত ছোট করতে করতে সে প্রাণপণ দৌড়াতে শুরু করলো। সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। পাহুম দেখতে পাচ্ছে বাশকিররা সূর্যের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। পাহুম জানে তাকে হার মানলে চলবে না। অনেক চেষ্টায়, অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত সূর্যাস্তের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সে পৌঁছে গেল যাত্রাস্থলে। বাশকিররা তার বিজয়ে আনন্দধ্বনি দিতে থাকলো। আনন্দে পাহুমের বুক ফুলে উঠলো। কিন্তু হায় ! ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত পাহুম হাঁফাতে হাঁফাতে পড়ে গিয়ে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। শেষ পর্যন্ত পাহুমের লোকজন সেখানেই তাকে মাত্র ৬ ফুট জায়গার মধ্যে দীনহীন একটি কবরে সমাহিত করলো। এখান থেকেই অনন্ত আঁধারের পথে শুরু হলো পাহুমের অন্তহীন যাত্রা; আর পশ্চাতে পড়ে রইলো তার সীমাহীন সম্পত্তি লাভের অপূর্ণ আশা। ক্ষমতা, সম্পদ ও কর্তৃত্বের মোহ কারো কারো কাছে এতই প্রবল যে, তারা কিছুতেই স্মরণ করতে চায় না মৃত্যুর পরে এর সাথে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন কিছুই করার থাকবে না, যদি রেখে যাওয়া সম্পদ ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বংশধরদের হাতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শূন্য হয়ে যায়। আসলে পরবর্তী বংশধররা পূর্ববর্তী দুই-তিন জেনারেশনের কথা ভবিষ্যতে মনেও রাখতে পারবে না। অতীত নিয়ে সময়ক্ষেপণের সুযোগও হয়তো তাদের থাকবে না। তাই বলে আমাদের নৈরাশ্যবাদী হলে চলবে না। সাধারণত সারাজীবন ধনবান থাকা এবং সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তিতে প্রতিপক্ষের উপরে কর্তৃত্ববান থাকার প্রবণতা থেকেই ক্ষমতাবানরা বৈধ-অবৈধ উপায়ে ক্ষমতাসীন হয়ে প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন-সম্পদ আহরণ ও সঞ্চয়ের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। একজন মানুষের জীবনে সম্পদের প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে ? কি পরিমাণ সম্পদ একজন লোক সারাজীবনে ভোগ করে যেতে পারে? বাস্তবে মানুষের দেহ ও মন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পর কোন বস্তু গ্রহণ করতে পারে না। তবু অহেতুক প্রচেষ্টায় সে তার ভোগের সামগ্রী, সম্পদ, সম্পত্তি যক্ষের মতো আগলে রাখতে চায়। প্রাকৃতিক নিয়মে এই জগতের তাবত্ সম্পদের উপর সকল মানুষের অধিকার রয়েছে। অথচ বাস্তবে কারো কারো আয়ত্তে অনেক বেশি থাকার কারণে কারো কারো কিছুই নেই। যুগে যুগে মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, লুণ্ঠন ও জড়োকরণের অনেক করুণ পরিণতি দেখা বা শোনার পরও মানুষ কোন না কোনভাবে প্রবৃত্তির শিকার হয়ে অপরিমিত সম্পদ আহরণের পথ থেকে সরে আসতে পারে না। তাই সীমিত জীবনে আহরিত অপরিমিত সম্পদের বোঝা পশ্চাতে ফেলে রেখেই তাদেরকে বিদায় নিতে হয়। লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল