বিদেশিরা পাচার করছে হাজার কোটি টাকা
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৩, ২৩:০২
নামমাত্র মূলধনে কোম্পানি খুলে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার করছে একটি চক্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট-এর সাম্প্রতিক এক তদন্তে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মূলত সেবা খাতের বিদেশি কোম্পানিগুলো এ অপকর্মের সাথে জড়িত। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন দেশীয় কিছু অসাধু উদ্যোক্তা। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি বিদেশি কোম্পানি তার আর্থিক বিবরণীতে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা তার এজেন্টকে পরিশোধের কথা বলেছে; কিন্তু কোম্পানিটির অডিট রিপোর্ট এবং আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাত্র ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা কমিশন হিসেবে জমা হয়েছে। বাকী অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ভঙ্গ করে কোম্পানিটি বিদেশে পাচার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মূলত সেবাখাতের বিদেশি কোম্পানিগুলো এ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। এসব কোম্পানিকে শৃংখলায় আনতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে; কিন্তু তাতে ফল আসেনি।
জানা গেছে, বিদেশি কোম্পানিগুলো ঘুষ দিয়ে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। নামমাত্র অর্থে তারা কোম্পানির নাম নিবন্ধন করলেও বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ বাবদ তাদেরকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে যেকোন খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়। তবে হাইকোর্টের এক রায়ে বিদেশি শিপিং এজেন্সি, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, এয়ারলাইন্স জিএসএ, ইন্ডেন্টিং, ডিস্ট্রিবিউশন এবং ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। একই সাথে ওই রায়ে দেশি এবং বিদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে এসব কোম্পানি স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ৫১ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। হাইকোর্ট এ বিষয়ে বাণিজ্য, অর্থ, আইন, শিক্ষা, নৌ, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থাকে নির্দেশ দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানছে না বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র। শুধু তাই নয়, বাণিজ্যিক সেবা খাত যেমন-শিপিং, বায়িং, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের জেনারেল সেলস এজেন্টসহ নানা ধরনের ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে বিদেশি উদ্যোক্তাদের চাকরি না দিতে আদালতের নির্দেশও মানা হচ্ছে না। এছাড়া বিনিয়োগ বোর্ডের পক্ষ হতে বার বার এ বিষয়ে তাগাদা দেয়া হলেও তাতে ফল মিলছে না।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আইন-কানুন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভারত, শ্রীলংকাসহ অনেক দেশে সেবাখাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিধি-নিষেধ আছে; কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি ২০ বছর ধরে ঝুলে আছে।
এ কারণে বাংলাদেশে সেবাখাতে বিদেশিদের ব্যবসা করার ঢালাও অনুমতি দেয়া হচ্ছে। কোন কোন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ নেয়া হবে সে বিষয়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে আলাদা নীতিমালা আছে। ভারত সরকার কোনো খাতেই একটি বিদেশি কোম্পানিকে ৪৯ শতাংশের বেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয় না। ন্যূনতম তিন লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে পাকিস্তান সরকার ১০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়। আর শ্রীলংকান সরকার একটি বিনিয়োগ প্রস্তাবে মাত্র ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেবাখাতের কিছু বিদেশি কোম্পানি হরহামেশা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ওরিয়েন্ট ওভারসিজ কন্টেইনার লাইন (ওওসিএল) এবং ম্যাডেটেরিয়ার শিপিং কর্পোরেশন অন্যতম। ২০১০-১১ অর্থ বছরে ওওসিএল-এর কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটি সাড়ে ১৩ কোটি টাকা স্থানীয় এজেন্ট কন্টিনেন্টাল ট্রেডার্স বাংলাদেশকে কমিশন হিসেবে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে; কিন্তু কোম্পানিটির অডিট রিপোর্ট এবং আয়কর নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কন্টিনেন্টাল ট্রেডার্সকে তারা মাত্র ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা কমিশন হিসেবে দিয়েছে। বাকী অর্থ কোম্পানিটি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন না মেনে দেশের বাইরে পাচার করেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে জার্মান ভিত্তিক হ্যাপাগ-লেয়ড নামের একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত করে কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শতভাগ বিদেশি এই কোম্পানিকে ব্যবসা করার অনুমতি না দেয়ায় তারা ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয়। কোম্পানিটি তাদের শ্রীলংকার এজেন্টের সহায়তায় বাংলাদেশে এইচ কার্গো নামের একটি কোম্পানি গঠন করেছে। পরে জেবিএক্স লজিস্টিকস নামক একটি স্থানীয় কোম্পানির সাথে মিলে ব্যবসা পরিচালনা করছে কোম্পানিটি। এছাড়া কলম্বোর একটি শিপিং কোম্পানির ডিজিএম বেবিন ম্যাক একটি বিদেশি কোম্পানির হয়ে জেবিএক্স লজিস্টিক-এ কাজ করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।