পোশাক শিল্পে ফের অস্থিরতার আশঙ্কা
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৩, ০০:৩৯
তৈরি পোশাক কারখানায় আবারো অস্থিরতার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ও এর আশপাশের তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি, টিফিন ভাতা ও ওভার টাইম বিলের দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও কারখানা ভাংচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছে। হঠাত্ করে পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনাকে অশনি সংকেত হিসাবে দেখছে বিজিএমইএ। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, ঈদ সামনে রেখে মধ্য রমজানে ফের অশান্ত হয়ে উঠতে পারে তৈরি পোশাক শিল্পাঞ্চল। বেতন-ভাতা, বোনাস ও ছুটির দাবিকে কেন্দ্র করে ফুঁসে উঠতে পারে শ্রমিকরা। এ আশঙ্কা শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন, সাধারণ শ্রমিকদের। সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাও এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে আগাম সতর্কতা দিয়েছে। তবে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, ঈদ সামনে রেখে রমজানে কোন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না।
ইতিপূর্বে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া গত কয়েক বছর রোজা ও ঈদের সময় পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো যাতে ওই সময়ে টাকা সরবরাহ করতে পারে সেজন্য বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে আবেদনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। অস্থিরতা রোধ এবং যেকোন বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে শিল্পাঞ্চল পুলিশের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। পোশাক শিল্প খাতে অস্থিরতা ঠেকাতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে কোন কোন কারখানায় অস্থিরতা ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়তে পারে তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিজিএমইএ-এর সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ব্যাপারে বিজিএমইএ এক দফা মিটিং করেছে। সরকারি সিদ্ধান্তের পর বিজিএমইএ শ্রমিকদের নতুন বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য কারখানা মালিকদের নির্দেশনা দিবে।
গতকাল সোমবার দুপুরে ফের রাজধানীর মগবাজার এবং আশুলিয়ায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বাইপাইল এলাকার ফাউন্টেন, পলাশবাড়ী এলাকার ড্রেসআপ, চারাবাগ এলাকার অন্বেষা গার্মেন্টস এবং পলাশবাড়ী এলাকার পিজিসিএল পার্ল গার্মেন্টসের শ্রমিকরা যাতায়াত ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে এ বিক্ষোভ শুরু করে। এ বিক্ষোভের সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কয়েকটি গার্মেন্টসে ভাংচুর করে। এঘটনায় শিল্প পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ (এএসআই) কমপক্ষে ৩০ শ্রমিক আহত হয়েছেন। এদিকে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে দুইটি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য একটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আশুলিয়ার শ্রমিক বিক্ষোভের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার ফাউন্টেন গার্মেন্টস মেনুফ্যাকচারিং লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা টিফিনের টাকা ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে কারখানার ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তারা কর্তৃপক্ষকে আটকে রেখে কারখানার ভেতরে ভাংচুর চালান। পরে দুপুর ২টার দিকে তারা রাস্তায় নেমে নবীনগর কালিয়াকৈর সড়ক অবরোধ করে। উত্তেজিত শ্রমিকরা নবীনগর কালিয়াকৈর সড়কে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করেন। আশুলিয়া শিল্প পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তখন উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশের উপর চড়াও হয়। শ্রমিকরা পুলিশকে ধাওয়া করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে পুলিশ শ্রমিকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পুলিশ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় শিল্প পুলিশের এএসআই মনিরসহ কমপক্ষে ৩০ শ্রমিক আহত হন। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ব্যাপারে আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পরিদর্শক আব্দুস সাত্তার জানান, বেতন-ভাতা ও টিফিনের টাকা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করলে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, দুপুরে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলেও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এদিকে ফাউন্টেন গার্মেন্টসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আরিফুর রহমান মুরাদ জানান, শ্রমিকরা দুপুরের দিকে হঠাত্ করে ডাইনিং হলে বিক্ষোভ শুরু করে। এরপর তারা ডাইনিং হলে ভাংচুর চালায়। গার্মেন্টসের ঊর্ধ্বতনরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে শ্রমিকরা কারখানার কাটিং মেশিনের সিসি ক্যামেরা খুলে নেন এবং ভাংচুর চালান। পরে শিল্প পুলিশ আসলে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
এদিকে রাজধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত নাদিয়া ট্রাস্ট অ্যান্ড রিগ্যাল পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তিন দফা দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। আয়েশা নামে কারখানাটির এক সুইং অপারেটর জানান, নাস্তার (টিফিন) ভাতা, দুপুরের খাওয়ার (লাঞ্চ) ভাতা ও হাজিরা বোনাসের দাবিতে রবিবার বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকরা। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবারও তারা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
নাদিয়া ট্রাস্ট অ্যান্ড রিগ্যাল পোশাক কারখানার প্রায় এক হাজার ৩০০ শ্রমিক রয়েছেন। শ্রমিকদের দাবি হলো তাদের নাস্তার বিল ১২ থেকে ২০ টাকা এবং হাজিরা বোনাস ২০০ থেকে ৬০০ টাকা করতে হবে। এছাড়া এখন দুপুরের খাওয়ার বিল দেয়া হয় না। মাসে ৭৫০ টাকা করে খাওয়ার বিল দাবি করছেন শ্রমিকরা।
সংশ্লিষ্ট কারখানার সহকারী মহাব্যবস্থাপক সিরাজুল হক বলেন, শ্রমিকদের দাবি আংশিক মেনে নেয়া হয়েছে। রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক রয়েছে।