সাদা-কালো ছবি
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৩, ১৮:৩৯
আমরা এই এলাকায় অনেকদিন আছি। আনন্দে আছি। এতো সব আনন্দ, এতো কিছুর মধ্যে সবার একটা বিষয়ে ছিলো কৌতূহল। আমাদের কলোনীর মাঠে পূর্বদিকে একটি বাড়ি ছিলো দেড়তলা, একতলা আর তার ছাদের উপর দু’টো রুম। বাড়িটা খুব সুন্দর। ফুল গাছ, অনেক ফুল গাছ বাড়িটিতে। বাড়িটির পাশে খোদাই করে লেখা বাড়িটির নাম ‘কৃষ্ণচূড়া’। এই বাড়িতে শুধু একজন লোক থাকেন। বয়স ষাটের উপর তো হবেই। শান্ত, নীরব, চুপচাপ প্রকৃতির। কারও সাথে তেমন কথা বলেন না। তবে এলাকার মানুষ তাকে খুব পছন্দ করেন। এলাকার কোন সমস্যায় তিনিই প্রথমে এগিয়ে আসেন। এই যে কয়দিন আগে আমাদের এলাকায় খুব পানির সমস্যা ছিলো। ঐ দাদু এই সমস্যার সমাধান করেছেন। সপ্তাহে তিনদিন সুবিধা-বঞ্চিতদের তিনি পড়ান। বিভিন্ন ফান্ডে তিনি অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। দাদুর সামনে কেউ প্রশংসা না করলেও সবাই তার আড়ালে খুব প্রশংসা করেন। কিন্তু সবার একটা প্রশ্ন ছিলো তিনি কেন একা থাকেন, কারও সাথে কথা বলেন না। সবার থেকে বোধহয় আমিই একটু বেশি কৌতূহল ছিলাম সেজন্য আমি একদিন তার বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছিলাম। গেটের কাছে দাঁড়ালাম, আমি একটা ফোকর আবিষ্কার করলাম, সেখান দিয়ে বাড়িটার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। বেশ সুন্দর সবুজ-সবুজ গাছপালা উঠোন জুড়ে সবজির গাছ, ফুল গাছ। আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। উফ কী রোদ, না আর দাঁড়াতে পারছি না। আমি ঘরে ফিরে এলাম। রাতের বেলা আমার চোখে ঘুম নেই, শুধু ঐ বাড়িটার কথা মনে পড়ছে। ইস একটু যদি ভেতরে যেতে পারতাম।
এসএসসি পরীক্ষার পর আমার হাতে এখন বিশাল ছুটি। একদিন বিকেলে আমার বান্ধবী রজনীদের বাসায় গেলাম। সেখানে গিয়ে অনেককে পেলাম। আমার পুরোনো বন্ধু মশিউল সেখানে ছিল। আর রজনীর দাদা, দাদী, চাচা, চাচী ছিল। অনেক ভালো লাগছে। বেশ গল্প হচ্ছিল। এর ফাঁকে আমি কৃষ্ণচূড়া বাড়িটির কথা বললাম।
রজনীর দাদা বলল, ‘ও তুমি রুস্তম খন্দকারের কথা বলছ, হ্যাঁ ও তো বেশ দেশপ্রেমিক।
তোমরা কী জানো সে কিন্তু একজন সাহসী সফল মুক্তিযোদ্ধা, ও তো আমাদের ক্লাসমেট ছিল, যা প্রান্তবন্ত আর হাসিখুশি ছিলো। ওর কথা ব্যবহারে সবাই সজীব হয়ে যেতে।” কিন্তু!
কিন্তু কী দাদা বলুন না।
“কিন্তু কীসের জন্য যে ও এরকম একগুঁয়ে আর নীরব হয়ে গেল। কিন্তু ওর দেশের প্রতি ভালোবাসা, ভালো কাজ করা থামেনি। দেশকে, মানুষকে ভালো কিছু দিতে ও যে কী প্রগতিশীল।
আমার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল, ইশ মানুষটার সাথে একটু দেখা করতে পারতাম।
রাতেরবেলা ঘুম এলো না, মাথায় যে রুস্তম দাদুর কথা ঢুকলো। শুধু মনে পড়ছে রুস্তম দাদুর কথা আর বাড়িটার কথা। পরদিন সকালে গেলাম। ঐ কৃষ্ণচূড়া বাড়িটির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। কেউ নেই। নীরব-নিস্তব্ধ। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখলাম সুন্দর বাগান।
আমার কী যে ঢুকতে মন চাইলো, কিন্তু কিভাবে, গেটে এতো বড় তালা।
আমি একটু বসলাম, গভীর চিন্তায় পড়লাম, কীভাবে রুস্তম দাদার সাথে কথা বলা যায়।
“কী তুমি রোজ এখানে আসো দেখছি কিসের জন্য।” আমি চমকে গেলাম, পেছন ফিরে তাকতেই দেখি- গেট খুলে দাঁড়িয়ে আছে রুস্তম দাদু। আমি ভয়ে দাঁড়ালাম, হাত-পা কাঁপছিলো।
রুস্তম দাদু তাহলে বাড়িতেই ছিল, তাহলে গেটে তালা ছিল যে।
রুস্তম দাদু বলল, এসো ভেতরে এসো। আসবে?
না না ঠিক আছে আমি যাই বলে, দিলাম দৌড়।
বাসায় এসে আফসোস করতে লাগলাম, কেন যে ঢুকলাম না বাসায়। ইশ কেন?
এতো বড় সুযোগটি হারালাম।
পরদিন আমার বান্ধবী রজনীকে সব বললাম। রজনী সব শুনলো, আমি রজনীকে একসাথে যাওয়ার কথা বললাম, রজনী রাজি হলো।
সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিট।
আমি আর রজনী দাঁড়িয়ে আছি।
না দেখা পেলাম না রুস্তম দাদুর।
আমি হাল ছেড়ে বললাম- চল চলে যাই।
আর কতোক্ষণ থাকবো।
উঠে চলে আসার সময় হঠাত্ পিছন দিক থেকে একজন বলে উঠল- এসো ভেতরে। আসবে?
রজনী আর আমি চমকে গেলাম।
একজন একজনের দিকে চোখাচোখি করতেই রুস্তম দাদা বলল- ভয় নেই। আসতে পারো যদি তোমাদের ইচ্ছে থাকে।
রজনী আমার হাত ধরে আস্তে বলল- চল যাই।
আমি আর কিছু না ভেবে সায় দিলাম।
ভেতরে ঢুকে রজনী আর আমি তো মুগ্ধ।
এতো সুন্দর সাজানো-গোছানো। কি সুন্দর বাগান। বাসার ভেতরটাও খুব সুন্দর। স্নিগ্ধ একটা ভাব আছে। তবে সব থেকে আমার নজর গেল একটা ছবির দিকে। ড্রইংরুমে রাখা বেশ বড় করে বাঁধানো সাদা-কালো ছবি। একটি সাইকেলে একটা যুবক বয়সের ছেলে আর সামনে বসা একটা কিশোরী মেয়ে।
ছেলেটি সাইকেল চলিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি সিঁথি করে দু’টি বেণী করা, ছেলেটির চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
কী দারুণ ছবিটি! অনেকক্ষণ আমি আর রজনী দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
রুস্তম দাদা এসে বলল, ছবি দেখছ?
রজনী বলল- কী দারুণ ছবিটি, ছবিতে যে, সে কী আপনি।
রুস্তম দাদা মাথা আস্তে করে নাড়ালো- হ্যা আমি।
রজনী বলল- আর উনি?
রুস্তম দাদা কিছু বলল না। চুপ করে রইল।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম ছবির মেয়েটি কে?
রুস্তম দাদু চোখ থেকে চশমা খুলে টিস্যু দিয়ে মুছতে লাগলেন, কিছু বললেন না।
আমি আবার বললাম, উনি কে?
রুস্তম দাদু বললেন, ও সুলতানা।
আমরা এক পাড়াতে থাকতাম। সুলতানা আমার বন্ধু, ছোটবেলায় ওকে আমি ভীষণ আদর করতাম।
১৯৭১-এর ২৬ মার্চ।
আমি তখন বয়সে টগবগে তরুণ। দেশের এরকম অবস্থা অবিচার, অন্যায় জুলুম চলছে। আমি ঘরে বসে থাকি কী করে। আমি যোগ দিলাম মুক্তিবাহিনীর দলে।
১৯৭১-এর জুন-জুলাই মাস, যুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে।
আমি এখন ক্যাম্পে। টানা চার মাস বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ নেই। কারো সাথে দেখা নেই।
এক রাতে আমি আদরের সুলতানাকে স্বপ্নে দেখলাম।
ও আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে।
কী যেন বলতে চাইছে।
আমি ঘুম থেকে উঠলাম, ঘড়ি দেখলাম। রাত দু’টা পঁয়তাল্লিশ। ক্যাম্পে কাজ চলছে, কেউ ঘুমাচ্ছে। কেউ পরিকল্পনা করছে পরবর্তী কাজের। কাউকে কিছু না বলে, আমি গোপনে গ্রামে চলে এলাম।
তখন পাকিস্তানী শকুনরা পুরো গ্রাম ঘিরে রেখেছে।
আমি আমাদের বাসায় ঢুকেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। পুরো বাড়ি তছনছ। এলোমেলো। কেউ নেই। আমাদের বাড়ির এক বৃদ্ধার কাছে শুনলাম পরশু পাকিস্তানীরা সুলতানা ওর ভাই-বোন, বাবা-মাকে পুড়িয়ে মেরেছে।
রাতের অন্ধকারে আমি আর পাড়ার কয়েকজন মিলে সামনের কবরস্থানে দাফন করাই।
কথাগুলো শুনে আর চলার শক্তি পেলাম না।
স্তব্ধ হয়ে কতোক্ষণ বসে রইলাম। তারপর কবরস্থানে গেলাম। মোনাজাত করলাম। ফেরার পথে ঐদিন আবার সুলতানাদের বাসায় গেলাম ঐ সাইকেলে চড়া ছবিটা আনার উদ্দেশ্যে। আমি ছবিটা আনার সময় একটা ডাইরী আর নকশী কাঁথা দেখতে পেলাম।
ডাইরিটায় সুলতানা একটা ছড়া লিখেছিলো—“দেশ একদিন স্বাধীন হবে / নাম তার বাংলাদেশ। / আমার দেশ অনেক সবুজ / রঙ-বেরঙের বাংলাদেশ।’
নকশী কাঁথায় ছিলো মুক্তিযোদ্ধার হাতে পতাকা। আমাদের দেখালো সেগুলো রুস্তম দাদা।
কী সুন্দর মুক্তোর মতোন হাতের লেখা।
আর নিখুঁতভাবে তোলা সুঁই-সূতার মাধ্যমে নকশী কাঁথার ছবিটি। অপূর্ব।
আমি আর রজনী যখন বাইরে বেরুবো সে সময় রুস্তম দাদা তার পেয়ারা গাছ থেকে আমাদের পেয়ারা পেড়ে দিল। রুস্তম দাদা বললো—জীবনটা অনেক সুন্দর। যদি তুমি সবাইকে ভালোবাসো। এই কথাটা মনে রাখবে। আর সময়ের কাজ সময়ে শেষ করবে। তোমরা আবার এসো।