পরীক্ষার জন্য রোগী পাঠানো হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি চক্র। রোগীদের জিম্মি করে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। অথচ এসব দেখার যেন কেউই নেই। জানা গেছে, ১২শ’ শয্যার এ হাসপাতালে ওয়ার্ড রয়েছে ৫৭টি। প্রতিদিন হাসপাতালটিতে চিকিত্সা নেন দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। বড় চিকিত্সা কেন্দ্র হওয়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রোগীরা ভিড় জমান এ হাসপাতালে। রোগীদের জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে হাসপাতাল কেন্দ্রিক নানা বাণিজ্য। হাসপাতাল থেকে নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়ের দূরত্ব সাকুল্যে ২০০ মিটারের মত। হেঁটে যেতে সময় লাগতে পারে কয়েক মিনিট। কিন্তু পরীক্ষা- নিরীক্ষার জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার এ স্বল্প পথ পাড়ি দিতে রোগীদের গুণতে হয় অন্তত ৪০০ টাকা ভ্যান ভাড়া।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ভ্যান চালকরা এভাবে জিম্মি করে রেখেছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। তাতে যোগসাজশ রয়েছে হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মী এবং আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। এদের মধ্যে অন্তত দেড়শ রোগী থাকেন মুমূর্ষু অবস্থায়। যাদের জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। সার্বক্ষণিক রোগী ভর্তি হলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত রোগ নির্ণয় হয় হাসপাতালে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে হাসপাতালের কিছু যন্ত্রপাতি অচল করে রেখে রোগীদের পাঠানো হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।  

সূত্র জানায়, গত ২৩ জানুয়ারি থেকে হাসপাতালের সিটি স্ক্যান মেশিনটি বিকল রয়েছে। সচল অবস্থায় প্রতিদিন সিটি স্ক্যান সেবা পেয়েছেন অন্তত ২০ রোগী। এমআরআই মেশিন সচল থাকলেও সেবা পাচ্ছেন দিনে মাত্র ৫ থেকে ৭ জন। এ ক্ষেত্রে ভরসা বাইরের রোগ নির্ণয় কেন্দ্রগুলো। তাছাড়া দুপুরের পর ভর্তি রোগীদের রোগ নির্ণয়ে যেতে হচ্ছে বাইরেই।

সম্প্রতি স্ট্রোক করে দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালে আসেন খাইরুল ইসলাম (৬৫)। জরুরী বিভাগ থেকে তাকে পাঠানো হয় নিউরো মেডিসিন বিভাগে। ওয়ার্ডের দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিত্সক সিটি স্ক্যান-এমআরআই করতে নগরীর বেসরকারি একটি রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের নাম বলে দেন। রোগীর স্বজনরা বলেন, সেখানে নেওয়ার জন্য জরুরী বিভাগের সামনে আসতেই রোগীর ট্রলি ঘিরে ধরে কয়েকজন ভ্যান, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস চালক। আগে থেকেই জরুরী বিভাগের সামনের গাছ তলায় বসে ছিল তারা। রোগীর অবস্থা বিবেচনায় ভ্যানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর এ জন্য গুনতে হলো ৪০০ টাকা ভাড়া। রোগ নির্ণয়ে বাড়তি খরচের সাথে বাড়তি ভ্যান ভাড়ায় চরম বিপাকে পড়েন তারা।

প্রতিদিন হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে অন্তত সাতটি ভ্যান নিয়ে চালকরা অপেক্ষমাণ থাকে। এরা হাসপাতাল সংলগ্ন আশেপাশের এলাকার বাসিন্দা। রোগী বহনের জন্য বিশেষ কায়দায় ভ্যান তৈরি করেছে এরা। স্বল্প দূরত্বের ভাড়া এতো বেশি কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে একজন ভ্যান চালক বলেন, ‘দিনে দুই থেকে তিনটি ভাড়া তারা পান। ক্লিনিকে আনা নেওয়া ছাড়াও তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও সহায়তা করেন। হাসপাতালে থাকতে ম্যানেজ করতে হয় পুলিশ-আনসারদের। বাড়তি ভাড়া না আদায় করলে টেকা মুশকিল। তবে রোগীদের তারা জোর করেন না বলে দাবি করেন অপর এক ভ্যান চালক।’ রামেক হাসপাতালের বেশির ভাগ ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, কোনো না কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে লক্ষ্মীপুর মোড়ের বিভিন্ন রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে।

রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি ভ্যান ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এনামুল হক। তার ভাষ্য, এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তেমন কিছু করার নেই। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়, সেসব হাসপাতালেই করার কথা। কিন্তু বাইরের ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কেন পাঠানো হচ্ছে বলতে পারবো না। এটা চিকিত্সকরাই ভালো বলতে পারবেন।

রামেক হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের এই জিম্মি করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই নানা অব্যবস্থাপনা চলে আসছে হাসপাতালে। এতে হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত।