বাঙালির জীবনও আনন্দলোকে ও আলোকলোকে
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৩, ২১:১২
সামাজিক সংকীর্ণতায় পশ্চাত্পদ দেশে ভালো কিছুর বাহবা বা প্রশংসা মেলে না সহজে। আমাদের স্বভাবটাই নেগেটিভ হয়ে গেছে প্রায়। নানা টানা-পোড়েন আর রাজনীতির জটিলতায় জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এই দুর্বিষহ কঠিন জীবনে আর যাই থাক, সরলতা থাকে না। সারল্যহীন মানুষ নিজেকেই বিশ্বাস করে না, অন্যের ব্যাপার তো বহু দূরের কথা। খুব সাধারণ একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা সহজ হয়ে উঠবে। কোন আড্ডায় এসে কেউ যদি তার নতুন চাকরির উচ্চ বেতন বা পদ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে, আমরা মুখে হাঁ হাঁ বললেও আড় চোখে একে অপরকে ঠাউরাই, চোখে চোখে প্রশ্ন করি কি বলছে এসব? সত্যি তো? হয়তো বিষয়টা খানিকটা ফাঁপানো, হয়তো একশ পার্সেন্ট সত্য, তারপরও আমাদের শুরুটাই সন্দেহ দিয়ে। এই সন্দেহ বা সংশয় এসেছে জীবনের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। একদা অবস্থা এমন ছিল না, আমরা তখন বাস করতাম বিশ্বাসের এক পবিত্র জগতে। মানুষকে অমৃতের সন্তান বলে গণ্য করা হতো, হতো বলেই ফরিদপুরের অজ পাড়াগাঁর এক সাধারণ মানুষ হতে পেরেছেন বিশ্বনন্দিত স্বাধীনতার মুক্তি দূত। তাঁর উত্থান অবদি রাজনীতি, মিডিয়া, গণতন্ত্র বা উন্নয়ন সবকিছুতে একটা সামঞ্জস্য ছিল। কেউ কারোর প্রতি রুষ্ট হলেও হিংস্র বা ভয়ানক হয়ে ওঠার রেওয়াজ ছিল না। সে কালে বাঙালির ঘর আলো করা প্রিন্টিং মিডিয়া বা কাগজটির নাম ইত্তেফাক। না ছিল টিভির চ্যানেল, না অত এফএম রেডিও, না মোবাইল, না কম্পিউটার, আকাশ সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায় তার বিন্দুবিসর্গও জানতাম না আমরা। সাদা-কালো ছবির সে জমানায় মানুষের মনেও কাজ করতো দুটি রং, দুটি বিশ্বাস, একটি সফেদ, অন্যটি কালো। বর্ণচোরাদের আধিপত্য ছিল না, মানুষ তখনো রাজনীতি করতো, শিল্প চর্চা করতো, মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, কিন্তু এখনকার মতো নেগেটিভিটির চর্চা ছিল না। এর ওপর যোগ হয়েছে চতুরতা, কে যে কার দলে, কে যে কোন পক্ষে বোঝা মুশকিল। মিডিয়ার নিরপেক্ষতা বা পক্ষপাতদুষ্ট না হওয়াটাও এখন প্রশ্নের মুখে। একটা দেশ বা জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না’টাই হচ্ছে মূল নীতি। আমাদের মিডিয়া কর্তারা তাও মানেননি। আগে ঝটপট বক্তৃতা-বিবৃতি জাগরণের মাথার ওপর পত্রিকার ব্যানার সাইন বোর্ড টানিয়ে পরে বুঝলেন এথিক্স বলেও নাকি একটা ব্যাপার আছে।
সাংবাদিকতা বা মিডিয়ার এথিক্স বা নৈতিক বোধ আসলে মাটি থেকে হঠাত্ গজায় না। একদিনে জন্মায় না, যে কারণে সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বুঝেছেন, বুঝেছেন বর্ষীয়ান সম্পাদক তোয়াব খান। ঐ যে বলছিলাম, দোদুল্যমানতা আর নেগেটিভ চর্চা, সেটাই আমাদের দেশ ও জাতিকে ঘিরে ধরেছে। পাশের দেশ ভারত ও তার প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য পশ্চিম বাংলার মিডিয়ার দিকে তাকালেও এর উত্তর মিলবে। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে উল্টো ডাঙ্গার মোড়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু ভেঙ্গে পড়েছিল। লজ্জা তো বটেই, প্রাণনাশের দৃষ্টিকোণেও ভয়াবহ ঘটনা। খুলে দেখুন তাদের কাগজ বা অন্য মিডিয়া, ছাপলে বা প্রকাশ করলেও ফলাও করেনি। কিছুদিন আগে ঐ বঙ্গে ধর্মভিত্তিক টেনশান সামাজিক অসন্তোষের রূপ নিয়েছিল প্রায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছি ভয়ানক অস্থিরতা বিরাজ করছিল, প্রায় দাঙ্গা বা বিক্ষোভের রূপ নেয়ার মত। ধন্যবাদ তাদের, ব্যাপারটাকে গোড়াতেই বিনাশ করেছেন বলে। শিক্ষণীয় দিকটি হচ্ছে আমাদের মত কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্রকে বড় করে তোলে না তারা। আনন্দবাজার বা যেকোন মিডিয়ায় এ দিকটি লক্ষ্য করার মত। তাদের আপদ-বিপদ বা নেগেটিভ দিক আমাদের থেকে কম কিছু নয়, কিন্তু তার পরিবেশনায় উন্মাদনা বা উত্তেজনা নেই। এই পরিমিতি বোধ না থাকলে পজেটিভ মানুষ বা জাতি গঠন অসম্ভব। একেবারে চলতি ঘটনাই দেখুন, পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরির খ্যাতি অর্জনকারী আশরাফুলকে নিয়ে চলছে তুগলকি কারবার। যেন তার শাস্তি বা দোষ নিরূপণ মিডিয়ার দায়িত্ব। এই জাতীয় নেগেটিভ প্রচারণায় সাময়িক কাটতি বাড়লেও জাতি বা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের মনে যে কালো মেঘ দানা বাঁধছে তা কোনদিন ছেড়ে কথা বলবে না।
কি যে হয়েছে আমাদের, সব বিষয়ে ব্যাপক উত্তেজনা আর তুমূল তর্ক-বিতর্ক না হলে যেন ভাত হজম হয় না। কথায় বলে দুধ বিক্রি করতে হয় ঘরে গিয়ে আর মদ খায় মানুষ মদের দোকানে ঢুকে, পানশালায়। মন্দ বিষয়ের উগ্র প্রভাব দূর প্রবাসেও ডানা ঝাপটাচ্ছে। যেখানে যাই কেউ আর বাঙালি বা বাংলাদেশি নেই, হয় আওয়ামী নয় বিএনপি বা হেফাজতি। এই বিভাজনের পেছনে রাজনীতি যেমন সক্রিয় তেমনি দায়ী অপপ্রচার। হাতে গোনা দু’ একটি পত্রিকা ও মিডিয়া বাদ দিলে বাকিরা মহা আনন্দে তা করে চলেছেন। অথচ মানুষ টাকা খরচ করে এগুলো কেনে, দেখে বা শোনে স্বস্তি ও আনন্দের জন্য। এমন নয় যে, আমাদের দেশে ভালো খবর বা ভালো বিষয় তৈরি হয় না। প্রতিনিয়ত হচ্ছে, হবেও, কিন্তু দুর্গন্ধের নাক আতর বা গোলোপের ঘ্রাণ নিতে চায় না। সে দিকে মুখ ফেরাতেই হবে। এ দায়িত্ব সভ্যতার, সভ্যতাপ্রিয় মিডিয়ারও বটে।
(সিডনি থেকে)