জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কান্না থামানো দরকার
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৩, ২১:২৩
লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন চিরচেনা বেদনার বসত ঘর। এ ঘরে আলো পৌঁছাতে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর জীবনের অনেকটা সময় মাটিতে চাপা পড়ে যায়। অথচ শিক্ষাকে সহজলভ্য করার জন্য ১৯৯২ সালের ২১শে অক্টোবরে ঢাকার গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এরই ধারাবাহিকতায় সারা বাংলাদেশের সরকারি কলেজগুলোতে শুরু হয় অনার্স কোর্স। প্রথম পর্যায়ে অনার্স কোর্স তিন বছর হলেও ২০০২ সাল থেকে তা করা হয় চার বছর। অথচ এই চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করতে একজন শিক্ষার্থীর সময় লাগে ছয় বছর। এ বিষয়টি জানার পরেও লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে এ বিদ্যাপীঠে। এখানে যারা পড়ে তারা প্রায় শতভাগই নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও এরা কিন্তু মেধায় গরিব নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিট ক্যাপাসিটি কম থাকার কারণে শিক্ষার্থীর একটা বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এখানেও রীতিমত মেধার পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করেই ভর্তি হতে হয় প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই।
চার বছরের কোর্স সম্পন্ন করতে ছয় বছর এবং এক বছরের মাস্টার্স সম্পন্ন করতে সময় লাগে আড়াই বছর। অর্থাত্ অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করতে যেখানে পাঁচ বছর লাগার কথা সেখানে সাড়ে সাত বছর সময় লেগে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ সেশনজটের কারণে একজন নিরপরাধ শিক্ষার্থীর জীবন থেকে সাড়ে তিনটা মহামূল্যবান বছর হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো সামগ্রিকভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে (এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি বছরে শুধু অনার্স শেষ করতে) নিট দুই লাখ বছর সময় অকারণে হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে এটা কি জাতির উন্নয়নে বড় বাধা নয়? শুধু কী তাই? কত শিক্ষার্থী ভয়াবহ সেশনজটের জালে পড়ে সাঁতার না জানা শিশুর মতো পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। ফলে কত পরিবার অসহায়ত্ব বরণ করছে এবং এর জন্য জাতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে , সেটা কি খতিয়ে দেখা দরকার নয়? দেখে মনে হচ্ছে —স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা শুকনো নদীর বুকে উত্তপ্ত বালির ওপর পড়ে পড়ে কাঁদছে দীর্ঘদিন ধরে, দেখার যেন কেউ নেই। এখানে অনিয়মই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখের।
একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে সাড়ে তিনটা বছর অকারণে নিয়ম করে হারিয়ে গেলে তার জীবনটা কতটা দুঃখময় হতে পারে সেটা একটু বিশ্লেষণ করা যাক—১. কমপক্ষে দুটি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া ২.পরিবারের অর্থকষ্ট বৃদ্ধি ৩. দিনের পর দিন হতাশা বৃদ্ধি ৪.সিনিয়র হয়ে জুনিয়রদের নিয়ন্ত্রণে চাকরি করা ৫.অন্য সুযোগগুলো থেকে দুই বছর বঞ্চিত থাকা। এই বিষয়গুলো আজ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনপথের সাথি হয়ে কষ্টময় জীবনচিত্র রচিত হচ্ছে যা বহুল পরিচিত ঘটনা। এই চিরচেনা সমস্যার সমাধান ছাড়া একটা জাতি কি আসলেই উন্নয়নের মুখ দেখার আশা করতে পারে?
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীকেও যদি প্রশ্ন করা হয়—এক বছর সমান কয় মাস? তাহলে অনায়াসে উত্তর আসবে ১২মাস। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বর্ষ সমান কমপক্ষে ১৮মাস লিখতে হবে। কারণ তার এক বছরের পরীক্ষা সম্পন্ন হতে সময় লাগে ১৮টা মাস। শুধু কী তাই—এখানে পরীক্ষার পরেও ফলাফলের জন্যও প্রায় ৮মাস অপেক্ষা করতে হয়। যেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনমান পরিচালনার জন্য কর্মী সংখ্যা বাড়ানো দরকার সেখানে কর্মী সংখ্যা ছাঁটাই করা হয়। সচেতন মহলের এসব কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের জীবনকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে তা আজ জরুরিভাবে ভেবে দেখা দরকার।
বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যাঁরা পরিচালনা করছেন আমার মনে হয় তাঁরা শুধু ধূসর আকাশকে দেখেন কিন্তু আকাশের যে কষ্ট আছে এবং সেই কষ্টের জোয়ারে এদেশ বিপন্ন হতে পারে তা অনুভব করেন না্। অথচ দেশের সমগ্র শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ কিন্তু এ বিদ্যাপীঠেরই। এই অসহায় শিক্ষার্থীদের কান্না, পরিচালনা পরিষদের সচেতন মহলের মনের ঘরে পৌঁছায় না। কারণ তাদের আদরের দুলালরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। আর যদি পড়তো তাহলে তাঁরা বুঝতেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কান্নাটা কত কষ্টের।
আমরা জানি, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। জাতিকে শক্তিশালী এবং বিশ্বদরবারে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হলে দেশের বিরাজমান সমস্যার সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভয়াবহ সেশনজট মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারের একান্তভাবে মনে করা উচিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারেরই সন্তান এবং তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত না করলে এ দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রয়াস কখনোই সফল হবে না।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ