ঝালে ঝোলে অম্বলে

বাজেটের তাপ

বর্তমানে বাংলাদেশে চলছে বর্ষা মৌসুম। অনেকে আবার এ সময়টাকে আম-কাঁঠালের মৌসুমও বলে থাকে। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে আমাদের দেশে জুন-জুলাই সময়টা পরিণত হয়েছে ‘বেশি কথার বলা’র মৌসুমে। এ মৌসুমে কেন জানি সবাই বেশি বেশি বকবক করে। এর মূল কারণ সম্ভবত নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। রীতি অনুযায়ী আমাদের দেশে জুন মাসেই জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়। আর বাজেট মানেই হচ্ছে কথার ফুলঝুরি। আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলাতে নানারকম গোঁজামিল, ভালো ভালো বাক্য দিয়ে বাজেটকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা। সরকারি দলের নেতা-কর্মী-স্তাবকরা না বুঝেই বাজেটের পক্ষে দিস্তার পর দিস্তা বাক্য রচনা করে যান। এটা যে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ বাজেট তা প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগে যান। পক্ষান্তরে বিরোধী দল বাজেট উপস্থাপন করা মাত্রই ‘গণবিরোধী বাজেট’ প্রত্যাখ্যান করেন। এজন্য তাদের কোনোরকম অর্থনৈতিক জ্ঞান এবং জানা-বোঝার দরকার হয় না। বিরোধী দলের কাছে বাজেট মানেই হচ্ছে ‘দিকনির্দেশনাহীন, গরিব মারার লুটপাটের বাজেট’। কীভাবে? তা তারা জানেন না। জানার দরকারও হয় না। এবার দীর্ঘদিন পর সংসদে যোগ দিয়ে বিএনপির এমপিরা সংসদকে তাঁতিয়ে তুলেছেন। তারা বাজেট বাদ দিয়ে ‘বাজে’ আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন বেশি। বলার ক্ষেত্রে তারা ব্যাকরণ-রীতি-নীতি-ভব্যতা কোনো কিছুরই ধার ধারছেন না। এদিকে বিএনপিওয়ালারা পাছে কোনো একটা ছুতো দেখিয়ে ভেগে না যায়—এজন্য সরকারি দলও জেনে-শুনে বিষ হজম করছেন। অর্থাত্ সংসদে তাদের বলার অধিকার এখনও খর্ব করছেন না। এতে করে কথার ওপর চাপটা একটু বেশিই পড়ছে। একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী আছেন যারা আবার নানারকম কথার মারপ্যাঁচে দুর্বোধ্যতার আবহ তৈরি করেন। তাদের বাজেট আলোচনা শুনলে বা পড়লে কারো পক্ষে বোঝার উপায় নেই বাজেট ভালো না মন্দ। ‘এও হয় অও হয়’ মার্কা নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরাও কথার ভেলকি কম দেখান না! এদিকে জনগণের কাছে বাজেট মানেই হচ্ছে নতুন করের বোঝা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে আরেক দফা নাকানি-চুবানি। বাজেট ঘোষিত হলে জনগণ সঙ্গত কারণেই ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে যায়। প্রতিকারহীন ক্ষোভ বেহুদা বেশি কথায় পর্যবসিত হয়। শুধু জনগণই নয়, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, এনজিও, সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদসহ সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বাজেট-প্রতিক্রিয়ায় মুখর হয়ে ওঠে। বাজেট নিয়ে সভা-সেমিনার-গোলটেবিল বৈঠক-আলোচনা ইত্যাদির জোয়ার বয়ে যায়। বাজেট নিয়ে কিছু বলা প্রত্যেকেরই যেন পরম কর্তব্যে পরিণত হয়। ক্ষমতাসীনরা ঘোষিত বাজেটের পক্ষে সমবেত প্রশংসা-সঙ্গীত পরিবেশনে মত্ত হয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে পুরো দেশ কথায় কথায় সয়লাব হয়ে যায়। এত যে কথা, সমালোচনা, ক্ষোভ, পরামর্শ, সুপারিশ—ক্ষমতাসীনরা এসবের তোয়াক্কা না করে তাদের স্বার্থ ও সুবিধা আদায়ের বাজেট ঠিকই প্রণয়ন ও গ্রহণ করেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশে বর্তমানে যে অর্থনীতি চালু রয়েছে সেখানে বাজেটের জাদুকরী ফল হচ্ছে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া, ক্রমাগত বাড়তে থাকা। আমাদের দেশে অবশ্য জিনিসপত্রের দাম বাড়ার জন্য বাজেটের অপেক্ষা করতে হয় না। দাম বাড়ার জন্য কোনো কারণও লাগে না। বাজেটের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঝড়, বৃষ্টি হলে বাড়ে, না হলেও বাড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লেও বাড়ে। তবে বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম কমলেও আমাদের দেশে দাম কমে না। এমনকি দেশে বাম্পার ফলন হলেও খাদ্যশস্যের দাম কমে না। মানুষের বয়সের মতো, আমাদের জীবনের সামগ্রিক হতাশার মতো জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ে, বাড়তেই থাকে। দাম অবশ্য আপনা-আপনি বাড়ে না, বাড়ানো হয়। বলা বাহুল্য, এ দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, আড়তদার, চাঁদাবাজ ইত্যাদির ভূমিকা থাকলেও সরকারের ভূমিকাই প্রধান। দাম বাড়লে সরকার যাদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আসে বা টিকে থাকে—সেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজির ধ্বজাধারীদের লাভ হয়। পাবলিকের তাতে বারোটা বাজে ঠিকই; কিন্তু পাবলিকের স্বার্থ কে দেখে? ওদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় বিদেশিদের কাছে ধরনা দেয়া হচ্ছে। পায়ে ধরে বিদেশিদের ডেকে আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে—আসুন, বিনিয়োগ করুন। আপনাদের জন্য সব নিয়ম-নীতি, বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। কেবল আপনারা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করুন। কিন্তু বিনিয়োগের পক্ষে যে আসল বাধা সেগুলো দূর করা হচ্ছে না। বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশও তৈরি করা হচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়েই থাকছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থ প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যক্কারজনক শর্তে অর্থ ভিক্ষা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমাদের উদ্ধার করুন, আমরা বড় লোকের স্বার্থ দেখছি, গরিবদের ঠাণ্ডা করার যাবতীয় নীতি প্রণয়ন করেছি, কালো কানুন চালু রেখেছি, বিরোধী মতকে দমন করে ‘সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা’ করেছি। সুতরাং আমাদের ঋণ দিন। কিন্তু তের মণ ঘি ঢালার পরও রাধা নাচে না। অগত্যা জোড়াতালির সহজ-সরল পথেই ফিরতে হয়। সরকার চলতি অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করেছে সেখানে গোঁজামিলই দেখা গেছে বেশি। দুর্নীতি দমন, অপচয় রোধ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো নীতি চোখে পড়েনি। বাজেটে যে বিশাল ঘাটতি রেখে দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে সার্বিক মূদ্রানীতির সমন্বয় কি করে হবে—এ বিষয়েও নেই কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। সপ্তদশ, অষ্টদশ বা উনিশ শতকীয় কায়দায় বোম্বেটে দস্যু বা সৈন্য-সামন্ত নামিয়ে একটি স্বাধীন দেশকে পরাধীন করার কৌশল মান্ধাতার আমলের বলে এখন সর্বস্বীকৃত। পরিবর্তে যে প্রণালীর উদ্ভব হয়েছে তা আর্থিক কলাকৌশলের মধ্যবর্তিতায়, দেশি মুদ্রায় অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে, দেশকে সস্তা ঋণের লোভ দেখিয়ে, ঋণের ফাঁদে ফেলা, শর্তের জালে বেঁধে ফেলে স্বার্থ হাসিল করা। আরও একটা মজার ব্যাপার, যত বেশি আমাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটবে, তত বেশি বৈদেশিক মুদ্রার হিসেবে আমাদের ওপর ঋণের বোঝা আরও বেশি করে চাপবে। চোর-জোচ্চর-বাটপাড়বান্ধব দেশ এটা। এখানে নানা ফিকিরে রাতারাতি বড়লোক হওয়া মানুষগুলোর ওপর ব্যাপক কর চাপানোর কাজটি কখনই করা হয় না। তাদের সাত খুন মাফ। হঠাত্ বড়লোক হওয়া কালো টাকার মালিকদের ধরার জন্য এখানে নেই কোনো কার্যকর ও সৃজনশীল উদ্যোগ। উল্টো তাদের কালো টাকা সাদা করার জন্য নানা প্রক্রিয়া-পদ্ধতি বাতলে দেয়া হয়। কিন্তু কর চাপানো হয়, বেশিরভাগ পরোক্ষ কর, গরিব মানুষের ওপর। ভ্যাট ইত্যাদি করের হার যত বাড়ে, জিনিসপত্রের দাম তত বাড়ে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে জমিদার, ব্যবসায়ী, পুঁজিপতিদের পোয়াবারো। গরিবদের সর্বনাশ। এ সর্বনাশের অবকাঠামো গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে। সৌখিন বিলাসদ্রব্যের আমদানি দিন দিন বাড়ছে। বিদেশি ভোগ্যপণ্য, সুখের পাত্র পূর্ণ করার জন্য নানা উপাচার, বিদেশি মদ, বিদেশি জামা-কাপড়, আসবাব থেকে শুরু করে বিদেশি সংস্কৃতি পর্যন্ত। যাদের সঞ্চয়ের সাধ্য ছিল, তাদের সম্ভোগের লোভ দেখানো হচ্ছে এসব আমদানির অবাধ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। তালিম দেয়া হচ্ছে ভোগ করুন, আরও, আরও, আরও। সঞ্চয়ের ব্যাপার নিয়ে কেউ চিন্তা করবেন না। চালের বদলে ভ্যানিশিং ক্রিম কিনুন। বেকার? কোনো চিন্তা নেই। সস্তায় রঙিন টিভি পাওয়া যায়। কারও বুকে ছুরি ধরে কিছু টাকা বাগিয়ে নিন। সেই টাকায় একটা কালার টিভি কিনে দিন-রাত বসে বসে রিমোটের বোতাম টিপুন। ঐশ্বরিয়ার ভুবনমোহিনী রূপ ও নাচ দেখুন। ধুমধারাক্কা টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট দেখুন। কেউ আর বেকার থাকবেন না। আমাদের দেশে টিভি দেখাও কাজ! তাহলে সঞ্চয় কে করবে? সঞ্চয় না হলে দেশের উন্নতিইবা কীভাবে ঘটবে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মিলবে, বিদেশিরা এসে আমাদের এখানে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে আমাদের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য সব কিছুর প্রসার ঘটবে। কিন্তু সেই বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের দেশে হয় না। বিনিয়োগকারীদের পায়ে তেল মেখে, চা-সিগারেট খাইয়েও মন ভেজানো যায় না। গত দুই যুগ ধরে নানা চেহারা, চরিত্র ও পরিচয়ের কর্তাব্যক্তিরা কত কান্নাকাটি করলেন, নতজানু হয়ে বসে বললেন— প্রভুগণ আমরা আপনাদের গোলাম, একটু দয়া করুন, একটু প্রসাদ দিন, আল্লাহর দোহাই একটু তাকান; কিন্তু বিদেশি পুঁজিপতিদের পাষাণ হূদয় তাতে গলে না। আর গলবেইবা কীভাবে? শুধু আবেদন-নিবেদনে তো আর কাজ হয় না। তারা দেখে তাদের স্বার্থ। যে দেশে আইনের শাসন নেই, রাজনৈতিক স্থিতি নেই—সেখানে কে বিনিয়োগ করতে আসবে? এ দেশে তাদের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশও সৃষ্টি হয় না, কাজেই বিদেশি বিনিয়োগও এদেশে আসে না। যতটুকু যা আসে তাতে বড়লোকের সম্ভোগ আর স্বার্থ সাধনেই সব ব্যয় হয়ে যায়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ, হতদরিদ্র মানুষ, তারা কেবল প্রতিশ্রুতি আর বক্তৃতা গিলেই সময় পার করে দেন। তাদের জীবনে আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আর বঞ্চনা ছাড়া অন্য কোনো যৌতুক নেই। কাজেই জুন-জুলাই মৌসুমটা শুধু বেশি কথা বলার ঋতু নয়, নিদারুণ যন্ত্রণার কালও বটে! এবারের বাজেট-মৌসুমে প্রকৃতি ও বাজেটের উত্তাপের পাশাপাশি বিরোধী দলের এমপিরা, বিশেষ করে নারী এমপিরা যেভাবে সংসদ-বক্তৃতায় ‘আগুনের গোলা’ নিক্ষেপ করছেন তাতে আমাদের অবস্থা আরও ভাজা ভাজা হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে! এই বৈরী পরিস্থিতিতে কাকে বলবো, দোহাই আপনাদের, আমাদের একটু স্বস্তি দিন! কে শুনবে আমাদের যন্ত্রণার কথা? লেখক :কলামিস্ট