অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ থামাতেই হবে

আনচান করছে বুকের ভেতরটায়। মনে হচ্ছে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে; ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়। রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখে এমন ভয় হচ্ছে। আবহাওয়াটা গোমটই ঠেকছে। আলোর দেখা মিলছে না। যুদ্ধ হচ্ছে। যুদ্ধ আরও হবে। সে যুদ্ধে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হবে। চলতি বছর জুড়ে যা দেখছি ভাবছি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না তো? খবরের কাগজগুলোতে যে সংবাদ ছাপছে তা হলো, ‘দেশ দিন দিন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে।’ ব্যাংকগুলো সংকটে পড়ছে। সরকারও ঋণ নিচ্ছে অস্বাভাবিক হারে। পত্রিকায় নিত্যকার এসব সংবাদ সারাক্ষণই চোখের সামনে ভাসে। দেশ জুড়ে চলমান নৈরাজ্য আর অব্যাহত তাণ্ডবের কারণে দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। মারাত্মক অসুবিধায় পড়ছে সাধারণ জনগণ। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত ছিল, তাতে অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন, বাংলাদেশ অচিরেই মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হবে। বিশ্বে অনেক দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দা, তখন আমাদের দেশে বার্ষিক উন্নয়নের ধারা সাড়ে ৬ শতাংশ। কিন্তু এ ধারা এখন আর বহাল থাকছে না। হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দেশের শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, ব্যবসা প্রভৃতি প্রতিটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণে-অকারণে নির্বিচারে কলকারখানা, বিদ্যুত্ কেন্দ্র ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। দেশের বিকাশমান অর্থনীতিকে বাঁচাতে সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। প্রয়োজন সমঝোতার রাজনীতির। রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুত্, অবকাঠামো সমস্যা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদে শিল্পের উত্পাদন খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বোঝাই যাচ্ছে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা মনে করছেন বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুুকূল পরিবেশ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ১৪৬৬। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬০২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এক হাজার ৬২৬ নিবন্ধিত প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল ৭৯৭০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাবেই এ সময়ে প্রকল্প নিবন্ধন কমেছে ১৬০ এবং প্রস্তাবিত বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১৯৪৫৬ কোটি টাকা। শতাংশ হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে ৬৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৫৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। দেশের রফতানি খাত অনেক আগে থেকেই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। রফতানি আয়ের প্রধান খাতগুলো লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে কোনো কোনো সময় এক মাসের ব্যবধানেই আয় কমে যাচ্ছে এমনকি ৩৯ শতাংশ পর্যন্তও। ওদিকে রফতানি অর্ডারই শুধু কমে যাচ্ছে না, পুরনো অনেক অর্ডারও বাতিল হয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের অন্তত ৩৫ ভাগ গার্মেন্ট কারখানা উত্পাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ২৪শ’ কারখানা। সাভার দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। এমন অবস্থায় বিশেষ করে গার্মেন্ট খাতকে রক্ষার জন্য শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা ও উত্পাদন নিশ্চিত করার, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সরবরাহ বাড়ানোর, সড়কপথের সংস্কার এবং সুষ্ঠু বন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি খাতের এই বিপর্যয় নিঃসন্দেহে ভীতিকর। কারণ, বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসে রফতানি আয় থেকে। সে আয় যখন এক মাসেই ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। জ্বালানি তেলের সঙ্গে বেড়ে চলেছে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের ভাড়া। পাল্ল¬া দিয়ে বাড়ছে বাড়ি ভাড়া। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দামও বাড়িয়ে চলেছে সরকার। অন্যদিকে এসবের তুলনায় আয় তো বাড়ছেই না বরং অনেকের রোজগার কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়েই শ্রমজীবী মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মধ্যবিত্তরাও চোখে অন্ধকার দেখছেন। মূল্য ও ব্যয় শুধু খাদ্যের বাড়ছে না। এসবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যানবাহনের ভাড়া যেমন বাড়ানো হচ্ছে তেমনি বাড়ানো হচ্ছে বাড়ি ভাড়াও। অর্থাত্ বিক্রেতা থেকে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের মালিকরা তো বটেই, বাড়িওয়ালারাও যার যার ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য দাম ও ভাড়া বাড়িয়ে চলেছেন। মাঝখান দিয়ে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সংকটের প্রভাবে ভেঙে পড়তে বসেছে দেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। স্থবির হয়ে পড়ছে কল-কারখানার উত্পাদন। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য। টানা হরতাল ও সহিংসতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে সংকট বাড়ছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ। সহিংস ঘটনার কারণে রাস্তাঘাট, সেতুসহ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের আশংকা, সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। মূলধনী, মধ্যবর্তী ও কাঁচামাল আমদানি না হলে উত্পাদন ব্যাহত হবে। এতে রফতানি কমে যাবে। এ অবস্থায় আমরা আশা করব যে, সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। অর্থনীতির ক্ষতি হয়, এমন কাজ থেকে তারা বিরত থাকবে। এ অবস্থা থেকে যেকোন মূল্যে আমাদের সরে আসতে হবে। লেখক: সাংবাদিক