হুমকির মুখে কর্ণফুলী :পরিবর্তন দরকার আত্মঘাতী মানসিকতার
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৩, ২১:৩৬
শিরা-উপশিরার মতো যে শত-সহস্র নদী আমাদের দেশের প্রকৃতির সহিত জড়াইয়া রহিয়াছে, তাহাদের আমরা বিপন্ন করিয়া তুলিতেছি। ঢাকার চারিপার্শ্বের নদীগুলিকে আমরা বর্জ্যনালায় পরিণত করিয়াছি অনেক আগেই। সেই রাহুগ্রাসেই এক্ষণে বিপন্নতার নিয়ন্ত্রণ রেখায় ধুিঁকতেছে দেশের বেশকিছু নদী, যাহার ভিতরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী অন্যতম। তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে হালদা এবং কক্সবাজারের বাকখালী নদী।
কর্ণফুলী নদীকে ধ্বংস করিবার যত আয়োজন তাহার তালিকা দেখিয়া আক্ষেপ জাগিবে— যেই ডালের উপর উপবিষ্ট হইয়া আছি, আমরা তাহাই কিনা কর্তন করিতেছি শিল্পকারখানার মুনাফার সামান্য অংশকে ছাড় না দেওয়ার হীন মানসিকতায়! শিল্প বিকাশের জন্য শিল্পকারখানা নির্মাণ হইতেই পারে নদীসংলগ্ন অঞ্চলে। কিন্তু তাহাতে যাহাতে নদীদূষণ না ঘটে, সেই অত্যাবশ্যক নিয়মের ভিতরে বর্জ্য শোধনাগার বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবস্থা অপরিহার্য। অথচ আমরা এতোটাই আত্মঘাতী মানসিকতার যে, মুনাফার সামান্য অংশও এই খাতে ব্যয় করিতে কুণ্ঠা বোধ করি।
জানা গিয়াছে, একুশ বত্সর পূর্বে কর্ণফুলী নদীর দীর্ঘ ২৯২ বর্গমাইল এলাকায় সাত শতাধিক বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। বর্তমানে তাহার সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হইল, ইহার কোনোটিরই বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি নাই। কর্ণফুলী নদী দূষণের জন্য এই সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানই দায়ী। এমনকি শুধুমাত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ৭৬০ হইতে ৮০০ টন বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে ফেলে। ইহাছাড়াও জাহাজের দূষিত পানি, তেলসহ অন্যান্য আর্বজনা প্রতিদিনই কর্ণফুলীতে ফেলা হইতেছে। কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এখন ৮০ লাখ মানুষের বসবাস। এই মানুষের জীবন ধারণের একমাত্র ভরসা এই দূষিত পানিই। স্বভাবতই নদী তীরবর্তী অধিবাসীরা ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকির ভিতরে রহিয়াছেন, হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হইতেছেন বিবিধ জটিল রোগে। নদীতে মত্স্য ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবন ধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) গ্রহণযোগ্য মাত্রা হইল প্রতি লিটারে ৪ থেকে ৫ মিলিগ্রাম। অথচ কর্ণফুলীর অনেক স্থানে দ্রবীভূত অক্সিজেন পাওয়া গিয়াছে এক মিলিগ্রামেরও নিচে। সমুদ্র উপকূল জুড়িয়া তেলজাতীয় দূষণের মাত্রা এখন সর্বাধিক। হালদা নদী প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্র। লুসাই পাহাড় হইতে নামিয়া কর্ণফুলীর তিনটি ধারা—স্বাদু, মিশ্র ও লবণাক্ত জলগর্ভে ১৪০ প্রজাতির অগণন মত্স্য বিচরণ করিত। তাহাদের প্রায় ৪০ শতাংশ আজ বিলুপ্ত। হারাইয়া গিয়াছে অসংখ্য জলজ উদ্ভিদও, যাহারা অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা করিত। তাহাদের জায়গা দখল করিয়াছে অসংখ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য। দূষণের ফলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্রগুলিই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে অনেক প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন পরিবেশকবাদীরা। সুতরাং এই নদীতে জীববৈচিত্র্য কী উপায়ে বহাল থাকিবে?
শুধু দূষণ নহে, কর্ণফুলী নদীর দুই তীরও ক্রমশই সংকুচিত হইতেছে। তাহার কারণ দুই দশক ধরে ক্যাপিটাল ড্রেজিং হয় নাই এই নদীতে। ফলে জাগিয়া উঠিতেছে চর। আর এই চরের বিস্তীর্ণ অংশ প্রতিদিন দখল করিতেছে নদীখেকো ভূমিদস্যুরা। ড্রেজিংয়ের ১৫ বত্সর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হইলেও তাহা এখনও আলোর মুখ দেখে নাই। সুতরাং নদী বিপন্নতার কফিনে পেরেক ঠোকা চলিতেছে নিরন্তর। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কিছু বিশেষ সুবিধা পাইয়া এই কর্ণফুলী, হালদা ও বাকখালী নদী রাজধানী সংলগ্ন নদীগুলির পরিণতি লাভ করে নাই এখনো অব্দি। তাহা হইল—জোয়ার-ভাটা। জোয়ার-ভাটার কারণে এই সকল নদীতে দূষণের ভয়াবহতা তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হয়।
পৃথিবীর সকল দেশেই শিল্প-কারখানা রহিয়াছে। কিন্তু শিল্পসমৃদ্ধ ও শিল্পবান্ধব কোনো দেশই তাহার নদ-নদী, পরিবেশ-প্রতিবেশ আমাদের মতো এইভাবে দূষিত করে না। মুনাফার সামান্য অংশ ছাড় না দিয়া আমরা ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান’। এই আত্মঘাতী মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটিলে নদীদূষণের ছায়ায় আমরাও বিপন্ন হইব।