আলোকপাত
নারী ও শিশু এবং বিপন্ন মানবতা
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৩, ২১:৩৭
সীতাকে হরণ করে রাক্ষসরাজ রাবণ বন্দী করেছিলেন অশোককাননের সুরক্ষিত সুরম্য প্রাসাদে। তার লোভ ছিল। মোহ ছিল। কিন্তু বর্বরতা প্রকাশ পায়নি একবারও। এই নারীকে তিনি দিয়েছিলেন রথের সম্মান। পশুকুলে একটি প্রাণীর নাম হায়েনা। স্বভাবদোষে সে বড় কুিসত এবং কদর্য। সে কোনো প্রাণী বধ করে ধীরে-সুস্থে খেতে শেখেনি। নাগালে পেলেই হলো জীবিতাবস্থায় শিকারের আর্তনাদের মধ্যেই শুরু করবে ভক্ষণ। হিংসা দৃশ্যের দৃষ্টিগোচরে মানুষের মুখে ঘৃণাভরে উচ্চারিত হতে থাকে একটি শব্দ হায়েনা।
নারী সৃষ্টির প্রথম ফুল। যে আবার কন্যা জায়া জননী। পৃথিবীর শুদ্ধতম বস্তুটি মেলে একমাত্র মায়ের আঁচলে, কন্যার বাসনে এবং প্রিয়ার শীতলপাটিতে। কতোবার যে পানির গ্লাসটি বা খাবার বাসনটি ধুয়ে ধুয়ে ক্লান্ত হবে এই হাতগুলো তা পুরষ জানে না। দূরবাসী সন্তানকে এগিয়ে দিতে গিয়ে বিন্দু থেকে বিন্দুতর হতে থাকে জননীর দুই চোখ। ঘরে না ফেরা পর্যন্ত জানালায় বসে বসে নির্ঘুম রাত কাটায় প্রিয়তমার অশ্রুসিক্ত নয়নযুগল। মা-বাবাকে কাছে পেয়ে কি রকম জলভেজা হয়ে যায় দিকশূন্য কন্যার আঁখির কাজল! আর শিশু? সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কুসুম। যার হাসিতে ম্লান হয়ে পড়ে আকাশের চাঁদ।
জাপানী দ্বীপ ওকিনাওয়ায় আমেরিকার সেনা সদস্য কর্তৃক শিশু ধর্ষণ। সভ্য দেশের দাবিদার আমেরিকার কুসুমকুমারী মনিকা লিউনস্কি সে দেশের শীর্ষ ব্যক্তির হাতে নারীত্বের সবটুকু হারিয়ে খবরের অন্তরালে। ব্রিটেনের রাজবধূ ডায়নার ঘর পোড়া দুঃসহ জীবন এবং দুর্ঘটনার নাটকে জীবনের সমাপ্তি। ইতালির বৃদ্ধ বার্লোসকোনির শ্যেনদৃষ্টিতে কতো যে কিশোরী হয়েছে বিড়ম্বিতা। পাকিস্তানের স্কুলছাত্রী মালালার মাথায় তালেবানের গুলিবর্ষণ। নয়াদিল্লির মেডিক্যাল ছাত্রী জ্যোতিকে বাসের মধ্যে গণধর্ষণ। মালদ্বীপের ১৫ বছরের কিশোরী সত্ বাবার হাতে ধর্ষণ। এই কিশোরীই আবার এক যুবক কর্তৃক ধর্ষিতা। ধর্ষকদ্বয়ের খরব নেই উল্টো মেয়েটিকে সে দেশের আদালত কর্তৃক ১০০ বেত্রাঘাত ও ৮ মাস গৃহবন্দী রাখবার আদেশ। আফ্রিকার কৃষ্ণকুমারীরা পথেঘাটে লাঞ্ছনার শিকার। আফগানিস্থানে প্রেমের দায়ে পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড। চার বছরের ফুল-কুঁড়িও আর নিরাপদ নয় বর্বরতার হাত থেকে। এসব কি হচ্ছে পৃথিবীতে? কীটের দংশনে দিন দিন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়ছে আমাদের লালিত সভ্যতা। কি পূর্বে কি পশ্চিমে। কি উত্তরে কি দক্ষিণে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে কিশোরী ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন!
সোনার ছেলের মতো সোনার শব্দ যুগল যখন দেশের সাধারণ মানুষের মুখে উচ্চারিত হতে শুনি ইঙ্গিতবাহী বিশেষ অর্থে তখনই আমাদের অসংখ্য সোনার ছেলেকে সর্বাগ্রে এবং সকলের আগে দুরন্ত উচ্ছ্বাসে ছুটে যেতে দেখি এপ্রিল, ২০১৩ সাভারের ধসে পড়া রানা প্লাজায়। খেটে খাওয়া যৌবনদীপ্ত শত শত বিপন্ন তরুণ-তরুণীর প্রাণ বাঁচাবার অশেষ আনন্দে। এই ছুটে যাবার মিছিলে পোশাক-শ্রমিক তরুণী শাহিনা আক্তারের জীবনের প্রাণের স্পন্দন ধরে রাখবার শপথে অগ্নিদগ্ধ হয়ে জীবনকে বিসর্জন দিল যে এজাজ- সে-ই তো আমাদের সোনার ছেলে। আমাদের হাত থেকে জীবন বার বার ফসকে যায়। ফসকে যায় বাংলার কারবালা পিলখানায়, ক্ষুন্নিবৃত্তের আশুলিয়ায়, সাভারে কিংবা লঞ্চডুবির মেঘনায়। মৃতকে জীবনদানের কী অসীম আনন্দ সে এই তরুণরাই ভালো জানে।
মোহ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বর্বরতা অরণ্যের আদিমতার সুযোগ বুঝে জাপটে ধরা খাবলে ধরা। লঙ্কারাজ রাবণ মোহের প্রবলতায় নারীকে হরণ করেছিলেন মাত্র। আর এতইে ডুবলেন নিজে। ছাই হলো স্বপ্নপুরী লঙ্কা। এরই নাম রমণীয় বিপাক। পুরুষ শাসিত সমাজ মাঝে-মধ্যে বলে ওঠে উল্টোকথা। মেয়েরা তো সেজেগুজে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। দেশ-কাল-পাত্রভেদে আছে নিজস্ব কালচার। বীরপুরুষদের কাছে জিজ্ঞাসা কী ধরনের চালচলনে চার বছরের আফোটা কুসুমটি পরিত্রাণ পাবে ধর্ষণের হাত থেকে ? সমাজে, দেশে এবং দেশে দেশে এ আজ ভাববার বিষয়।
লেখক: কবি