পান থেকে চুন খসলে রক্ষা নেই গৃহশ্রমিকদের
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৩, ২১:৪৭
আট বছরের ছোট্ট শিশু লিপি। শীর্ণ হাত-পা, চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। পিঠে অনেকগুলো লম্বাটে সাদা দাগ। গৃহকত্রী লোহার রড উত্তপ্ত করে ছ্যাঁকা দিয়েছেন তাকে। গৃহকত্রীর কথামতো কাজ না করার অপরাধে দেয়া হয়েছে এ নির্মম শাস্তি। এ শুধু লিপির নয় কিংবা এক দিন নয়, দিনের পর দিন অনেক লিপি, সাথী, রিনার গৃহশ্রমিক হিসেবে শ্রমদানের নেপথ্যের ঘটনা। পান থেকে চুন খসলেই এরকম নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, হাজার হাজার সাথী প্রতিদিনই নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এদের অনেকে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক গৃহশ্রমিকের হত্যার পর গৃহকর্তা বা কত্রীকে বাঁচাতে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। গৃহশ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে অপমৃত্যু মামলাই বেশি করা হয় এবং পরে এ ঘটনাগুলো আর তদন্ত করে দেখতে অনীহা পুলিশের।
এ প্রসঙ্গে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম উপ-পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, এর কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি মামলার তদন্ত হয়। তদন্তে হত্যা প্রমাণিত হলে হত্যা মামলা করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই হতাহত গৃহকর্মীর স্বজনরা নির্যাতনকারী গৃহকর্তার সঙ্গে আপোস রফা করায় পুলিশের কাছে আসে না।
২০০৭ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিস (বিলস) এর গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ৫০ ভাগ গৃহপরিচারিকা তাদের নিয়োগকর্তার দ্বারা নির্যাতিত হয়। এদের ৫০ শতাংশই শিশু। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের নিয়োগ দেন। এ গবেষণায় আরো বলা হয়, গৃহশ্রমিকদের নিয়োগ চুক্তি নেই। তাদের মাসিক গড় মজুরি ৫০৯ দশমিক ৬ টাকা। এরমধ্যে নিয়মিত মজুরি পায় ৬০ শতাংশ এবং অনিয়মিত মজুরি পায় ৪০ শতাংশ। এত অল্প মজুরিতেও নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে তারা। এরমধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিক্ষার সুযোগ এবং ৫৩ দশমিক ৩৩ চিত্তবিনোদনের সুযোগ পায় না। বকাঝকার শিকার হয় ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সামর্থের অতিরিক্ত কাজ করে ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যৌননিপীড়ন সহ্য করে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, মানসিক হতাশায় ভোগে ৬৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ড্রইং রুমে ২০ শতাংশ, রান্নাঘরে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, বারান্দায় ১৬ দশমিক ৬৭, স্টোর রুমে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ গৃহকর্মী ঘুমায়। এদের মধ্যে ৩০ শতাংশই প্রতিদিন ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করে। ১৬ শতাংশ ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহিন আনাম বলেন, আমরা গৃহশ্রমিকদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য আইডি কার্ডের দাবি করছি তা পূরণ হলে ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে গৃহশ্রমকে অন্তর্ভূক্ত করলে আইনের আওতায় আনা যাবে অবস্থার উন্নতি হবে।
মহিলা আইনজীবী সমিতির পরিচালক অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, শ্রম আইনে গৃহশ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই গৃহশ্রমিকরা প্রতিনিয়ত শোষণ-বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এর অধীনেও গৃহকর্মীরা বিচার পায় না। গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালাও চূড়ান্ত হয়নি। আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে পারলেই নির্যাতন অনেক কম হতো।
ঝুলে আছে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা:খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের চার বছর হতে চললেও ঝুলে আছে গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা। কিছু সুপারিশ অন্তর্ভূক্তের নামে তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর। ফলে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বিশ্রাম, শিক্ষা, প্রসূতিকালীন সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লাখ লাখ গৃহকর্মী। আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষর করায় সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ২০১৪ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করার বাধ্যবাধকতা আছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মজিবুর রহমান বলেন, নীতিমালাটির খসড়া সংশোধন পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সংশোধনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ সমন্বয়ক ওয়াজেদুল ইসলাম বলেন, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালা তৈরি হলেও শুধু নৈতিক দায়িত্ব থেকেই কাজটি অতিসত্বর করা উচিত।