দলীয় সরকারে নির্বাচন হলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৩, ২২:৫৪
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের রক্তের দিকে তাকিয়ে শপথ নিয়েছি। গণতন্ত্রের দাবি আদায়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিয়েছি আমরা, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না।’
অন্যদিকে দলের ঢাকা মহানগরীর আহবায়ক সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়া হলে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘রক্তের বন্যা বয়ে যাবে তবুও শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।’ বিএনপির এমপি রেহেনা আক্তার রানুর সংসদে দেয়া বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে খোকা বলেন, ‘চুদুর-বুদুর বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক মেনে নিন। নইলে দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তার জন্য আপনাকেই দায়ী থাকতে হবে।’
গতকাল বুধবার বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির বিশাল সমাবেশে তারা এসব কথা বলেন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুন:প্রবর্তন, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রতিবাদ, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তি, সকল গণহত্যার প্রতিবাদ, দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার ও বিচার এবং অযোগ্য ও ব্যর্থ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এ সমাবেশ করে বিএনপি। বিকাল ৩টায় সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের দেয়াল ঘেঁষে উত্তরমুখী মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। সকাল থেকে সমাবেশস্থলের আশেপাশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
১৯৭৭ সালের ১ মে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ও পরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এ উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশে বক্তৃতা করেন। ওই সমাবেশের দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিএনপি এই প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলো। এর আগে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে বিএনপি; কিন্তু রাজপথে সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণ দেখিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেয় সরকার।
বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছা সেবকদলসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে পৌঁছালে গতকালের সমাবেশ বিশাল আকার ধারণ করে।
সাদেক হোসেন খোকার সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এজেড এম জাহিদ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের ভুঁইয়া, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, নির্বাহী কমিটির সদস্য হেলেন জেরিন খান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদিকা শিরিন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর সরাফত আলী সফু, যুব দলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নিরব, ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুস সালাম।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিনয়ের সঙ্গে আপনাকে বলতে চাই ১৯৯৬ সালেও একটি নির্বাচিত সরকার ছিল। তখন আপনি বলেছিলেন এই সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। আবার আজকে আপনিই বলছেন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। কিন্তু আমরা এই নির্বাচন হতে দেব না। এই দেশের মানুষ নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হতে দেবে না। যতই নির্যাতন করেন, যতই জেলে পাঠান কিন্তু দেশের মানুষ যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না।’
তিনি বলেন, চার সিটিতে ১৫ জুন নির্বাচন। এই নির্বাচনে গণতন্ত্রকামী মানুষেরা নিজেরা তাদের প্রতিনিধি দাঁড় করিয়েছে। প্রতিটি এলাকায়ই দেখা যাচ্ছে তাদের পক্ষে জনজোয়ার শুরু হয়েছে। সরকার সেই জোয়ার ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করছে। সরকার ছলে বলে কৌশলে জনগণের প্রার্থীকে পরাজিত করার চেষ্টা করছে। যদি তা করা হয় তাহলে জনগণই তার জবাব দেবে এবং সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ভারাক্রান্ত হূদয়ে তাদের কথা স্মরণ করি সেই সব এতিম ও আলেম-ওলামাদের কথা, যারা ৫ তারিখে শাপলা চত্বরে জালেম সরকারের জুলুমে নির্যাতিত হয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাদের কোন অপরাধ ছিল না। বিনা কারণে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু যতবার তারা ক্ষমতায় এসেছে গণতন্ত্রের গলা টিপে হত্যা করেছে। ’৭১-এ স্বাধীনতার পর মানুষ সুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু লাখ মানুষ আওয়ামী দুঃশাসনে দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিল। সেদিন একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করা হয়েছিল। সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছিল।
মির্জা ফখরুল বলেন, কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম মাহমুদুর রহমানকে আবার রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এই সরকার ’৯৬ সালেও ক্ষমতায় এসে দৈনিক বাংলা, টাইমস, বিচিত্রাসহ কয়েকটি পত্রিকা বন্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই আইন আগেও ছিল। কিন্তু এর ভয়াবহ পরিবর্তন করে নতুনভাবে পাস করেছে। এই আইন করে সরকারবিরোধীদের সন্ত্রাস আইনে দমন করা হবে। এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে বাতিল করার দাবি করছি।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বন্ধ করে রাখতে পারবেন না। শত শত ভাইকে জেলে নিয়ে নির্যাতন করে আন্দোলন করতে পারবেন না।
সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, এত ভয় কিসের। যদি দেশের এতই কাজ করেন তাহলে এত ভয় কিসের। লেভেল প্লেইং ফিল্ড করেন। সবাইকে খেলতে দিন। আসলে আপনারা বুঝতে পেরেছেন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে জামানত থাকবে না। সেজন্যই এই ব্যবস্থা বাতিল করেছেন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অভিযোগ করে বলেন, সরকারের সংলাপের কোনো সদিচ্ছা নেই। সংলাপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এক কথা বলেন, আর পরে সৈয়দ আশরাফ বলেন আরেক কথা। নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলে আমরা সে আহ্বানে সাড়া দেব। তিনি বলেন, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নাম কুড়িয়েছে সরকার। সংসদে এবং বাইরে আন্দোলন একসঙ্গে চলবে। ভবিষ্যতে জিয়া, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি বা অশালীন বক্তব্য দিলে উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে। তিনি বলেন, তারেক রহমানকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের দরকার নেই। তাদের হাজার হাজার ডলার দেয়ারও প্রয়োজন নেই। দেশের নেতৃত্ব নেয়ার জন্য তিনি নিজের ইচ্ছায়ই দেশে ফিরেবেন।
মওদুদ বলেন, এ পর্যন্ত কোনো আন্দোলনই বিফল হয়নি। আমাদের এই আন্দোলনও সফল হবে। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সংসদ এবং রাজপথে বিএনপির যুগপত্ আন্দোলন চলবে।
জমির উদ্দিন সরকার বলেন, জায়ায়াতের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারা এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না। কারণ তারা জনগণকে ভয় পায়। তারা দেশে কোনো উন্নতি করতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলে জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয় করবে। বিএনপি ৯০ ভাগ ভোট পেয়ে জয়ী হবে।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যদি কারচুপি করা হয় তবে সারাদেশে আগুন জ্বলবে। জনগণ জেগে উঠেছে, আন্দোলনের মুখে এই ফ্যাসিবাদী সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হবে।
আসম হান্নান শাহ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার কাদের ওপর ভরসা করে জনগণের দাবি নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে মানুষ তা বোঝে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় হবে। সে জন্য টালবাহানা করছে। এসব করে কূল রক্ষা হবে না।
সাদেক হোসেন খোকা বলেন, তারেক রহমান উপযুক্ত সময়েই দেশে ফিরবেন। মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখা যাবে না। তিনি বলেন, বিগত সেনা সমর্থিত সরকার অত্যাচার চালিয়ে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই অত্যাচারের সমুচিত ব্যবস্থা নেবে।