সিটি নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা নিরাপত্তা সংস্থার

খুলনায় সর্বহারা এবং রাজশাহী ও সিলেটে হেফাজত-শিবিরের কর্মকাণ্ড নিয়ে শংকিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তারা বোমাবাজি ও কেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা করছে। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্ট করতে পারে। গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বৈঠকে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা এড়াতে বিজয় মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আহ্বান জানান তারা। বৈঠকে ইসির কাছে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ৬০ জন সন্ত্রাসীর তালিকা হস্তান্তর করেছে। ভোট গ্রহণের আগেই এদেরকে ডিটেনশনে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর পক্ষ থেকে একটি তালিকা দেয়া হয়। ডিটেনশনে নেয়ার প্রস্তাব বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বিষয়টিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যে কোন পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে।’ বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সিইসিসহ ৫ নির্বাচন কমিশনার, কমিশন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে এনএসআই-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মনজুর আহমেদ, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকবর হোসেন, র্যাবের ডিজি মো. মোখলেছুর রহমান, ডিআইজি এসবি মোশারফ হোসেন ভুঁইয়া, কোস্টগার্ডের কমোডর রাজিব বিএন, আনসার ভিডিপির উপ-মহাপরিচালক একেএম মিজানুর রহমান এবং পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। কোনো কোনো জায়গায় কঠোর পদক্ষেপ বা বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেনা মোতায়েনের পরিস্থিতি আসেনি। আমাদেরকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত আছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা ও তত্পরতা বাড়ানো হয়েছে। বরিশাল ও খুলনায় কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করে র্যাব ও বিজিবিকে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নজরদারির মধ্যে আনা হয়েছে, বহিরাগতদের নির্দিষ্ট সময়ের আগে নির্বাচনী এলাকা থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে, বহিরাগতদের প্রবেশ রোধে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে এবং বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে জেলা প্রশাসককে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।’ সূত্র জানায়, বৈঠকে সিইসি বলেন, ভোট কেন্দ্র ও ভোটারদের যাতায়াতের নিরাপত্তা দিতে হবে। কেউ যেন কেন্দ্র দখল বা প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। কাউকে হুমকি মনে হলে তাকে গ্রেফতার করা যেতে পারে; কিন্তু এসব পদক্ষেপ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক নির্বাচনী আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি ও আচরণ বিধির বিষয়ে বৈঠকে ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এমন কিছু বিষয় আছে যা হয়ত আচরণবিধির মধ্যে পরে না; কিন্তু সাধারণ আইনেও ব্যবস্থা নেয়া যায়। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইসিকে জানান, জামায়াত-শিবির ও হেফাজতের নাশকতা শুধু ভোট কেন্দ্রে নয়, কেন্দ্রের বাইরে এমনকি নির্বাচনী এলাকার বাইরেও ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রাজশাহী ও সিলেট তাদের টার্গেট। চরমপন্থী দলগুলোর অবস্থানের কারণে খুলনাতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। নির্বাচনোত্তর সহিংসতা যাতে না হয় তার জন্য বিজয় মিছিলের কোন সুযোগ দেয়া যাবে না। মেয়র পদে বিজয়ীরা বিজয় মিছিল না করলেও কাউন্সিলর প্রার্থীরা এটা করার চেষ্টা করতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, কিছু কেন্দ্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের কোন সমস্যা হবে না। পুলিশ ও র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, হেফাজত আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিতে নিষেধ করে লিফলেট বিলি করছে এবং পোস্টার ছাপছে। তারা মতিঝিলে শাপলা চত্বরের অভিযান নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে; কিন্তু নির্বাচনী আচরণ বিধি অনুসারে এ প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নির্বাচনী আচরণ বিধি পরিবর্তন করা দরকার। এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এনএসআই থেকে চার সিটিতে সন্ত্রাসীদের যে তালিকা ইসিকে দেয়া হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়ত-শিবিরের লোকজন রয়েছে। তবে অধিকাংশ লোকই বিরোধী দলের সমর্থক। প্রচারণা শেষ হচ্ছে মধ্যরাতে এদিকে গতকাল মধ্যরাত থেকে বহিরাগত মুক্ত রাখতে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যেসকল কেন্দ্রীয় নেতা অবস্থান করছেন তাদেরকে মধ্যরাতের পর থেকে নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বহিরাগতদের জন্য প্রচারণার শেষ দিন হওয়ায় দুই দলের শতশত নেতা-কর্মী গতকাল সারাদিন নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। মন্ত্রী এবং দুই নেত্রী ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সব নেতাই প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। এছাড়া সিটি এলাকার পার্শ্ববর্তী বিভাগসূমহের উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউপি চেয়ারম্যানরা নিজ নিজ প্রার্থীর সমর্থনে সভা-সমাবেশ করেছেন।