সিলেটে জয় পরাজয় নির্ধারণে যত ফ্যাক্টর

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাকে বিজয়ী করবেন সেই হিসাব কষছেন ভোটাররা। নগরীর বর্তমান সমস্যা ও তার সমাধানে সদ্য পদত্যাগী মেয়রের উদ্যোগ, উভয় প্রার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়ন ও ভবিষ্যতে কাকে নির্বাচিত করলে তারা লাভবান হবেন সে বিষয়টি এখন প্রধান বিবেচ্য। প্রার্থীদের দলীয় অবস্থানের চেয়ে নগরীর উন্নয়ন এবং সন্ত্রাস দমনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে । সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ১৪ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং ১৮ দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর জয়-পরাজয়ে বেশকিছু বিষয় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দুই প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা এসব ফ্যাক্টর নিয়েই এখন চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত। এবারের সিটি নির্বাচনে মোট ভোট ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৬। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৮১ ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৫। মোট ভোটের মধ্যে দুইটি বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে কামরানের। যে কারণে তিনি ভোটের লড়াইয়ে বার বার জয়ী হয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন। তার আলোচিত দুই ভোট ব্যাংকে এবারো সোয়া লক্ষাধিক ভোট রয়েছে। এরমধ্যে আছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোট অর্ধলক্ষাধিক এবং ‘নন সিলেটী’ ভোট প্রায় পৌনে এক লাখ। নন সিলেটী ভোটের সিংহভাগ কামরান পাবেন বলে তার সমর্থকরা আশা করছেন। নগরীর শ্রমজীবী, রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, হকারসহ গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষের সাথে কামরানের যে সুসম্পর্ক রয়েছে তাও তার নির্বাচনে জয়লাভে ইতিবাচক ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করতে পারে। সাধারণ ভোটারদের অনেকেই বলেন, কামরানের ব্যবহার ভালো। যেকোন প্রয়োজনেই তাকে ডাক দিলে পাওয়া যায়। এক মেয়াদে পৌর চেয়ারম্যান ও টানা দুই মেয়াদে সিটি মেয়র হিসাবে প্রায় ১৮ বছর সিলেট নগরীর কর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অনেক ক্ষেত্রে সফল আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও রয়েছে। সেই ব্যর্থতাও নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। নির্বাচনে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও আরিফুল হক চৌধুরীর ভোটের লড়াইয়ে তাদের অতীত ইমেজ একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে সামনে এসেছে। অতীতে জনপ্রতিনিধি হিসাবে তাদের দু’জনকেই দেখেছেন নগরবাসী। আর তাদের সেই অতীতকে মূল্যায়ন করেই নগরবাসী আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন বলে অনেকে মনে করছেন। কামরান এবং আরিফুলের দলীয় ও জোটগত প্রভাবের পাশাপাশি তাদের নিজ নিজ ব্যক্তি ইমেজ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে একটি ফ্যাক্টর হবে। আরিফুলের ভোটের বাক্সে ইতিবাচক ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিতে পারে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের ইমেজ। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে সাইফুর রহমান সিলেট সদর আসনের এমপি হিসাবে সিলেট মহানগরীর বেশকিছু উন্নয়ন করেছেন। আর সিলেটে সাইফুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নেতা ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। যে কারণে ওই সময় তিনি সিটি কর্পোরেশনের একজন কাউন্সিলর হয়েও বিএনপি সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি করেছেন। একজন কাউন্সিলর হয়েও তিনি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক তত্পরতা দেখিয়েছেন। যার একটি ইতিবাচক প্রভাব তার নির্বাচনে পড়তে পারে। এছাড়া সাইফুর রহমানের তুলনায় বর্তমান অর্থমন্ত্রীর আমলে তেমন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়নি। বিএনপির দলীয় কোন্দলও আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনে একটি ফ্যাক্টর হতে পারে। কারণ ভোটের লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের ঘর সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এমনিতেই নানা গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত সিলেট বিএনপি সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরো বিভক্ত হয়েছে। দলীয় চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কড়া নির্দেশে দলের অপর তিন মেয়র প্রার্থী আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, নাসিম হোসাইন ও সামসুজ্জামান জামান বসে গেলেও নির্বাচনে তারা আরিফুলের জন্য কতটা কী করবেন বা করছেন তা নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। এই অবস্থায় নিজ দলের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন আদায়ে আরিফুলকে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকখানি বদলেছে। কামরান ও আরিফুলের ভোটে তাদের দলীয় ও জোটের তত্পরতাও ফ্যাক্টর হতে পারে। আরিফুলের পক্ষে বিএনপির শরীক দল জামায়াত, খেলাফত, জমিয়তসহ অন্যান্য দল আটঘাট বেঁধে নামলেও কামরানের পক্ষে ১৪ দলের শরীক দলগুলোর তত্পরতা সেভাবে চোখে পড়ছে না। সিলেট মহানগরীর ভাসমান ব্যবসায়ী, হকাররাও নির্বাচনে কামরান ও আরিফুলের জন্য ফ্যাক্টর হতে পারে। নগরীর বিভিন্ন মার্কেটের স্থায়ী ব্যবসায়ীরা অতীতে কামরান মেয়র থাকাকালে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের জন্য বার বার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু কামরান তাদেরকে উচ্ছেদ করেননি। এ অবস্থায় এবারের নির্বাচনে স্থায়ী ব্যবসায়ী ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের ভোট পাল্টাপাল্টি বাক্সে পড়তে পারে। সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নগরীর পুরনো সমস্যা ‘জলাবদ্ধতা’ ইস্যুটি বেশ একটি বড় ফ্যাক্টর হিসাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বৃষ্টি হলেই মেয়র প্রার্থী কামরান-আরিফের বিতর্কে তীব্রতা পায় জলাবদ্ধতা নিয়ে। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় ভুগছে সিলেটবাসী। অথচ এ বিষয়ে বর্তমান মেয়র তেমন পদক্ষেপ নেননি। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় আটকে যায় জীবনযাত্রা। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছেন ১৮ দলের মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জলাবদ্ধ এলাকায় গিয়ে ভোটারদের বলছেন নগরীতে ৯টি ছড়া, অসংখ্য খাল ও প্রবহমান একটি নদী থাকতে এই শহরে জলাবদ্ধতা থাকতে পারে না। এটা আন্তরিকতার অভাব। তিনি বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি ছড়া-খালকে লেকে পরিণত করে নগরীকে প্রথমেই জলাবদ্ধতামুক্ত ও নাগরিক সুবিধা সম্বলিত একটি উন্নত নগরীতে পরিণত করবো। তবে এ বিষয়টি মানতে নারাজ ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি বলেছেন, আগে বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানি স্থায়ীভাবে রয়ে যেত। এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেমে যায়। আর তা সম্ভব হয়েছে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ছড়া-খাল সংস্কারের ফলে।