আবুল হোসেনকে দুদকের মামলায় বাদ দেয়ায় বিশ্ব ব্যাংকের অসন্তোষ
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৩, ২২:৫৮
পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলার এজাহারে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আরো কয়েক ব্যক্তির নাম না থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তাদের মনে হয়েছে যে, ইচ্ছে করেই দুদক কারো কারো নাম এড়িয়ে গেছে। তদন্ত প্রক্রিয়ার এমন দুর্বলতা ও অস্বচ্ছতার কারণেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পে আর ফিরে আসতে পারেনি বিশ্ব ব্যাংক। গত মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়া বিশ্ব ব্যাংকের তদন্ত রিপোর্টে এসব বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।
প্রসঙ্গত, ঢাকায় নিযু্ক্ত বিশ্ব ব্যাংকের নতুন কান্ট্রি ডিরেক্টর জোহানেস জাট মঙ্গলবার দুপুরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে বিশ্ব ব্যাংকের চূড়ান্ত রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। তবে বিশ্ব ব্যাংক কিংবা বাংলাদেশ সরকার এখনো পর্যন্ত রিপোর্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টরের এক জিজ্ঞাসার জবাবে তাকে বলা হয়েছে যে, তারা ইচ্ছে করলে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এটি প্রকাশ করতে পারে। তবে গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংকের ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল একটি সূত্র ইত্তেফাককে জানিয়েছে যে, অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়া রিপোর্টটি কোনো তদন্ত রিপোর্ট নয়। এটি মূলত বিশ্ব ব্যাংকের নিযুক্ত এক্সটার্নাল বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট, যাতে প্রধানত বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অবশ্য এতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ মঞ্জুরি প্রক্রিয়ার ইতিবৃত্ত এবং শেষ পর্যন্ত ঋণ চুক্তি বাতিল ও উত্থাপিত অভিযোগের সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের খুঁটিনাটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রটি জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ব ব্যাংকের অনুরোধে এ বিষয়ে প্রথম তদন্ত শুরু করে কানাডার রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি)। ইতিমধ্যেই তাদের তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে অভিযোগটির বিচার প্রক্রিয়াও বেশ খানিকটা অগ্রসর হয়েছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের তরফে কার্যকর তদন্ত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রসর হয়নি। এখানে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার এক পর্যায়ে একটি মামলাও দায়ের করে; কিন্তু তাতে মূল অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ কয়েক জনের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়। মূলত দুদকের এই সিদ্ধান্তের বিষয়েই নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়াই কতিপয় কর্মকর্তার নামে একটি মামলা করেছে দুদক, যাতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসেনি। এমন খণ্ডিত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয় বলেও রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, পদ্মা দুর্নীতি ইস্যুতে দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়ার নানা অসংগতি ও অস্বচ্ছতা এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক শেষ পর্যন্ত কি কি যৌক্তিক কারণে ফিরে আসতে পারেনি, সে বিষয়ে রিপোর্টে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২৯১ কোটি ডলারের পদ্মাসেতু প্রকল্পে অর্থায়নকারী গ্রুপের লিড পার্টনার হিসাবে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। কিন্তু পরে দুর্নীটির অভিযোগ তুলে তা বাতিল করে বিশ্বব্যাংক এবং তাদের দেয়া শর্ত পূরণের দাবি জানায়। ঢাকা থেকে যাওয়ার প্রায় ৭ মাস পর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের রিপোর্ট সরকারের হাতে এসে পৌঁছালো। এরপর কবে নাগাদ রিপোর্টটি প্রকাশ করা হবে কিংবা আদৌ প্রকাশ করা হবে কিনা - সে ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের কিছু বলতে পারেননি। মঙ্গলবার দুপুরে রিপোর্টটি পাবার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি এখন আমার ব্যাগে আছে। এর বেশি কিছু এখন বলা যাবে না।