পবিত্র মেরাজের শিক্ষা
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৩, ১৯:১০
বছর ঘুরে বারবার ফিরে আসে পবিত্র শবে মেরাজ। এই সময়টাতে মেরাজ সংক্রান্ত আলোচনাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে সর্বত্র। আল্লাহ পাকের যে কোন কাজ বা সৃষ্টির মত মেরাজও এমনই একটা বিষয় যার আলোচনা কখনই শেষ হবার নয়। তাই এ বিষয়ে সবার অন্তহীন আগ্রহ এবং নিত্য নতুন আলোচনা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে এসব আলোচনা ও বিশ্লেষণের অধিকাংশই বর্তমান ‘ডট কম’ সভ্যতার চাহিদা মেটাতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে অবিশ্বাস্য সব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও যুক্তির যা কিনা স্পষ্টতই ছাড়িয়ে যাচ্ছে মেরাজের ওপর কোরআন-হাদিসে বর্ণিত বিবরণী সমূহের সীমানা। ফলে কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না এইসব বিশ্লেষণ। এহেন পরিস্থিতিতে কি হতে পারে তাত্পর্য পূর্ণ এই ঘটনার যথার্থ অভিব্যক্তি? কিভাবে মেরাজের বিশ্লেষণ করলে তা ছাড়িয়ে যাবে না কোরআন-হাদিসের নির্ধারিত সীমানা কিন্তু দিতে পারবে সমসাময়িক বহুবিধ জিজ্ঞাসার গ্রহণযোগ্য উত্তর? বিশ্ব জগতের কাণ্ডারি হয়ে এসেছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। তাঁর মু’জেযাহ সমূহের মধ্যে উদাহরণসহ উত্তর রয়েছে সমকালীন সব চ্যালেঞ্জের। মানুষ আজ গর্বিত চন্দ্র জয় করে। গ্রহান্তর জয় করার পথে এখন সে নিজের জ্ঞানকেই যথেষ্ট পরিপক্ব ভাবতে ব্যস্ত ও অভ্যস্ত। কিন্তু সে বুঝেও বুঝতে চায় না যে তার শক্তি নেই চাঁদকে ভেঙ্গে দু’টুকরো করার যা রসূলুল্লাহ (স.) করতে পেরেছিলেন আঙ্গুলের এক ছোট্ট ইশারায় শুধুমাত্র আল্লাহ পাকের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠতে পারার কারণে (সূরা৫৪:আয়াত১ এবং এ সংক্রান্ত বোখারী শরীফের হাদিস দ্রষ্টব্য)। গ্রহান্তর পাড়ি দিতে গিয়ে মানুষের ছুটে চলায় আজ গতি এসেছে। তার স্বপ্ন এখন ‘টাইম মেশিনে’চেপে ভবিষ্যত্ বিশ্ব ঘুরে ফিরে দেখা। মানুষের পক্ষে এমন কল্পনা ও পরিকল্পনা যে সম্ভব সেটাই বস্তুত:আল্লাহ পাক দেখিয়েছেন তাঁর প্রিয়তম বান্দা রসূলুল্লাহ (স.)-কে মেরাজে নেয়ার মাধ্যমে। নবীজীকে মেরাজে নিয়ে আল্লাহ পাক সমগ্র মানব জাতিকে যেন এ কথাটাই বলতে চেয়েছেন যে ‘টাইম মেশিনের’ঐ দুরূহ পাড়ি দিতে আল্লাহ পাকের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা অত্যাবশ্যক এবং তা পেতে পারে শুধুমাত্র তাঁর একনিষ্ঠ ইবাদতকারী ঘনিষ্ঠজনেরাই, অন্য কেউ নয়। সময়কে নিয়ে মানুষের গবেষণা ভাণ্ডারে আজ রয়েছে অনেক তথ্য। ‘ব্ল্যাক হোল’ যে সময়কে আটকে দিতে পারে তাও এখন আমাদের জানা। কিন্তু আল্লাহ পাক তো সময়েরও স্রষ্টা আবার ‘ব্ল্যাক হোলের’ও স্রষ্টা। তাই সময়কে আটকাতে তাঁর তো কোন মেকানিজমের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে তাঁর একটা হুকুমই তো যথেষ্ট হওয়ার কথা। বস্তুত: মে’রাজের রাতে সেটাই করে দেখিয়েছেন পরম শক্তিমান সর্বস্রষ্টা আল্লাহ তা’য়ালা। মেরাজ সংক্রান্ত হাদিসসমূহের বর্ণনাতে বলা হয়েছে যে সমগ্র সৃষ্ট জগতসমূহ পরিভ্রমণ শেষে ফিরে এসে রসূলুল্লাহ (স.) তাঁর অজুর পানিকে পেয়েছিলেন তখনও গড়িয়ে চলা অবস্থায়। বিছানা-বালিশ পেয়েছিলেন তেমনই উষ্ণ যেমন ছিল সেসব ছেড়ে যাওয়ার সময়। অর্থাত্ প্রিয় বন্ধুর সাক্ষাত্ লাভের যাত্রায় তথা মেরাজের মূহুর্তে মহাজগত্ জুড়ে সময় ছিল স্থির। নিথর ছিল সময়ের প্রবাহ। যা কিনা সমস্ত জগত সমূহের ওপর একক কর্তৃত্বের অধিকারী শুধুমাত্র আল্লাহ পাকের হুকুমেই সম্ভব। সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে কোন রকম বাহন ছাড়াই রসূলুল্লাহ (স.)-কে মেরাজে নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি পাঠিয়েছিলেন ‘বোরাক’। ‘আরশে আজিম’ পর্যন্ত নেয়া হয়েছিল ‘রফরফ’ নামকবাহনের মাধ্যমে (মেরাজ সংক্রান্ত বোখারী ও মুসলিম শরীফের হাদিস দ্রষ্টব্য)। এই দুই বাহন এবং নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে সেগুলোর পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের কাছে মহাকাশ সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় পরিষ্কার করেছেন দয়াময় আল্লাহ পাক। তার একটা হল মহাজাগতিক পরিভ্রমণে থাকবে এলাকা ভিত্তিক বিবিধ পর্যায় বা ধাপ যেসব অতিক্রম করতে প্রয়োজন হবে বিভিন্ন ধরনের বাহনের। বস্তুত: আমরা এখন নিয়মিতই তা করছি গ্রহান্তর পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে। আর অন্য বিষয়টা হলো আল্লাহ যেহেতু সব বিষয়ের ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান তাই তিনি চাইলে যে কোন সময় গাধা, ঘোড়া, খচ্চরের মত চতুষ্পদ প্রাণীকেও আলোর চেয়ে গতি সম্পন্ন করে মহাকাল ও মহাজগত্ পাড়ি দেয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন করতে পারেন। তাই অতি ভঙ্গুর যানবাহন নিয়ে নিকটস্থ কয়েকটা গ্রহ পাড়ি দিয়ে মানুষের জন্য কোন ভাবেই উচিত্ হবে না গর্বিত হওয়া। অন্যদিকে কোন ধরনের স্পেস স্যুট ছাড়াই প্রিয় বন্ধুকে সৃষ্টি সীমার ঊর্ধ্বে নিয়ে আল্লাহ পাক এটাও স্পষ্ট করেছেন যে শুধুমাত্র সময়, অভিকর্ষ বা মাধ্যাকর্ষণই নয় বরং এই সৃষ্ট জগতে যত ধরনের তত্ত্ব-সূত্র, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসমূহ চালু আছে সেগুলোর কোনটারই মুখাপেক্ষী নন সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক। বরং ঐ সব তত্ত্ব, সূত্র ও প্রযুক্তিসমূহ তথা সায়েন্স বলতে যা বুঝায় সেসবও একমাত্র তাঁরই সৃষ্টি। আর তাই তিনি সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান বা সায়েন্সরও ঊর্ধ্বে। চূড়ান্ত বিচারে সেগুলোও তাঁরই মুখাপেক্ষী এবং একমাত্র তাঁরই নির্দেশ পালনে বাধ্য। আল্লাহ পাক চাওয়া মাত্রই সেসব সায়েন্স, শক্তি ও সূত্রসমূহ স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে যে কোন সময় যে কোন স্থানে যে কারো জন্যে অকার্যকর হতে বা পরিবর্তিত হতে বাধ্য। সেজন্যেই মানুষের সূত্রবদ্ধ সীমিত যুক্তি, বুদ্ধি বা বিজ্ঞান দিয়ে মেরাজকে বিশ্লেষণ করা এবং এর প্রকৃত সব তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয় কখনই। তাই বিদ্যমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে মেরাজকে ব্যাখ্যা করার যে অব্যাহত চেষ্টা মানব সমাজে লক্ষ্য করা যায় তা আসলে নিতান্তই এক বৃথা চেষ্টা। এধরণের বিশ্লেষণগুলো প্রায়শই ছাড়িয়ে যায় এ সংক্রান্ত কোরআন-হাদিসের বক্তব্য ও বর্ণনার পরিসীমা। উদাহরণ স্বরূপ বোরাকের কথা বলা যায়।এই ‘বোরাক’-কে বর্তমান বিজ্ঞানের আলোকে অনেকেই এক ধরণের ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক যানবাহন বলে ব্যাখ্যা করতে নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু হাদিসে সুস্পষ্ট ভাবে ‘বোরাক’-কে একটি গাধা বা খচ্চর শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এটাকে যাতে একটা প্রাণী ছাড়া অন্য কিছু ভাবা সম্ভব না হয় সেটা নিশ্চিত করতে আরও পরিষ্কার করে বলে হয়েছে যে রসূলুল্লাহ (স.) কে দেখে বোরাক এমন ভাবে লাফালাফি করছিল যে নবীজী তার পিঠে উঠতে পারছিলেন না। এহেন অবস্থায় জিবরাঈল (আ.) বোরাককে আদেশ করেছিলেন শান্ত হতে এবং শুধুমাত্র তারপরই নবীজী তাতে চড়ে বসতে সক্ষম হয়েছিলেন। আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে মেরাজের পথে জেরুজালেমস্থ মসজিদুল আকসায় নামাজের জন্য যাত্রা বিরতির সময়টাতে এই ‘বোরাক’-কে এক ধারে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং সেই স্থানটা একটা কড়াদিয়ে এখনও চিহ্নিত করে রাখা আছে দর্শনার্থীদের জন্য।