বাজেটে কৃষি সেবা ও ভর্তুকি

মাননীয় অর্থমন্ত্রী বিগত ৬ জুন, ২০১৩ইং তারিখে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের জন্য ২ লক্ষ ২২ হাজার ৪ শত ৯১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন যা চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৭.৬৫ শতাংশ বেশি। আমরা আলোচনা করবো কৃষি বাজেট ও কৃষকের বাজেট সম্পর্কে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি ও দেশজ আভ্যন্তরীণ উত্পাদনে (জিডিপির) কৃষি খাতের অবদান ১৯.২ শতাংশ। বিগত চার বছরের হিসাবে দেখা যায় ক্রমাগত কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কমে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ২.৬ শতাংশ এবং এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে কৃষকরা তার বাজারজাতকৃত কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাস্তবতার নিরিখে প্রস্তাবিত বাজেটে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন খাত মিলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১২ হাজার ২৭৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা চলতি বছরের বাজেটের তুলনায় ১,৬৮,১০২ কোটি টাকা কম। শতকরা হিসাবে দেখা যায় যে, অনুন্নয়ন বাজেটের ৭.৯ শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেটের ৬.৩ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। উক্ত বাজেটের আওতায় কৃষি সমপ্রসারণ, উন্নত বীজ উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ এবং সেচ কার্যক্রমকে জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়াও কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চলতি অর্থ বছরে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল এবং দেড় লাখ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা হয়েছে এবং খাদ্য গুদামের বর্তমান ১৬ লাখ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা থেকে বাড়িয়ে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টনে উত্তীর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। এরি মধ্যে সরকারের প্রবর্তিত কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড ১.৪৩ কোটি কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং ৯৫ লাখ কৃষক এরি মধ্যে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পেয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কৃষি ভর্তুকিসহ বিশেষ কৃষিসহায়তা কার্যক্রম এবং কৃষি পণ্য রফতানি বৃদ্ধির জন্য সহায়তা প্রদান। আগামী অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকির জন্য ৯ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে যা চলতি বছরের তুলনায় ৩ হাজার কোটি টাকা কম। এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত বাজেট থেকে আগামী অর্থবছরে আর কোন প্রকার বকেয়া পরিশোধের প্রয়োজন হবে না। প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করতে গিয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কৃষি উত্পাদন ব্যয় হ্রাস এবং অন্যান্য উপায়ে কৃষককে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গৃহিত কিছু কিছু বাস্তবমুখী প্রদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন যেমন; (১) বিগত চার বছর এই মহাজোট সরকার কৃষিউন্নয়নে ২৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে যা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে; (২) চলতি অর্থবছরের তুলনায় কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪১৩০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫৯৫ কোটি টাকার প্রস্তাব কারা হয়েছে; (৩) দেশের ৩৫ জেলায় ২৫ শতাংশ ভর্তুকিতে ট্রাকটার, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের ব্যবস্থা অব্যাহত রেখে কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় বিনামূল্যে সার বীজ সরবরাহ। এই ক্রার্যক্রমের অংশ হিসাবে চলতি অর্থবছরে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩,৩২,৫০০ জন কৃষককে উফসী ও বোনা আউস চাষে বিনামূূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ করা হয়েছে যা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে; (৪) কৃষি বীমা চালু, কৃষি বিপণন দল গঠন, কৃষকদের জন্য কৃষি ক্লাব, কৃষি নীতির সফল বাস্তবায়ন ও পাটের উফসী জাত উদ্ভাবন, বর্গা চাষীদের জন্য ৫০০ কোটি টাকা পুন:অর্থায়ন তহবিল ইত্যাদি অ্যাহত থাকবে। বর্তমান মহাজোট সরকারের এটি শেষ বাজেট এবং এতে যেসকল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার সফল বাস্তবায়নে সময় পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ ৬ মাস। প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও যাদের জন্য এ সহায়তা তাদের কাছে কতটুকু পৌছে তা নিয়ে। বিষয়টি একধারে যেমন প্রশাসনিক অপরদিকে রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ। এ ব্যাপারে কার্যকরি পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রথমত: বাজার অর্থনীতির যুগে উত্পাদিত ও আমদানিকৃত কৃষি উপকরণ উত্পাদন তথা আমদানি পর্যায়ে ভর্তুতি প্রদান করা হয় এবং এসকল উপকরণের হ্রাসকৃত মূল্য প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) উদ্ভাবিত দ্বি-স্তর বিশিষ্ট সমবায় কাঠামো ব্যবহার করা যায়। এর মূল লক্ষ্য কৃষক প্রর্যায়ে উপকরণের প্রকৃত চাহিদা নির্ণয় এবং চাহিদা অনুযায়ী সমানুপাতিক ও ন্যায্য মূল্যে বন্টন নিশ্চিত কল্পে প্রকৃত কৃষকদের “পরিবার প্রধান ভিত্তিক বিশেষ পরিচিতি কার্ড” কৃষকদের দলগত স্বীকৃত সংস্থা ইউসিসিএ এর মাধ্যমে বিতরণ ও কৃষি উপকরণ বিপণন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে; দ্বিতীয়ত: দরিদ্র কৃষক কর্তৃক কৃষি পণ্যের ন্যয্য মূল্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে ইউসিসিএ-কে কেন্দ্র করে প্রতিটি গ্রাম সমবায়ের আওতায় কৃষি পণ্যের সমষ্টিগত বিপণন ব্যবস্থা ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলা যায়। এ বিপণন সমবায় সমিতি সচ্ছল না হয়ে উঠা পর্যন্ত একটি সাময়িক সময়ের জন্য কৃষি ভর্তুকি ও সুদ বিহীন ঋণ প্রদান করা যায়; তৃতীয়ত: চাষাবাদ, পশু পালন, মত্স্য চাষ ইত্যাদি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নতুন প্রজাতি সম্পর্কে ধারণা গ্রহণের লক্ষ্যে মনমানসিকতা পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন জাতি গঠন মূলক বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত কৃষি ভিত্তিক প্রশিক্ষণ সমূহকে সমন্বিত করে যতদূর সম্ভব কৃষকের কাছকাছি নিয়ে যাওয়া যায়; চতুর্থত: হর্টি কালচার, পশু পালন, হাস মুরগি পালন, বনায়ন, মৌমাছির চাষ ইত্যদির ক্ষেত্রে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রত্যেক কৃষি কর্মীকে সেবা প্রদানের স্বার্থে কৃষি ভর্তুকির অংশ থেকে প্রয়োজনীয় ওষধপত্রসহ একটি করে কিড বক্স সরবরাহ করা যেতে পারে ; পঞ্চমত: কৃষি উপকরণের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করণের ক্ষেত্রে সরকারি সেবাদান প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহের একটি সহযোগী সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আবহ গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উত্সাহ দেওয়ার জন্য চাষী-বান্ধব একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ কৃষি ভর্তুকির অর্থে গ্রহণ করা যায়। সর্বশেষে বলা যায়, সরকার ঘোষিত কৃষি সেবা কর্মসূচিকে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার, এনজিও, সিভিও, এসএসও, সমাজ কর্মী, রাজনীতিবিদসহ সকলকে একযোগে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে । তবেই বাজেটে প্রস্তাবিত ভর্তুকির জন্য প্রণীত লক্ষ্য অর্জন অনেকাংশে সহজতর হবে যা পরবর্তীতে সফল দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। লেখক : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা