দিবস
শিশুশ্রম :এক নির্মম বাস্তবতা
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৩, ২১:৫৭
গত ১২ জুন পালিত হল বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্যে ‘গৃহকর্মে শিশুশ্রমকে না বলুন’ শিরোনামে শিশুশ্রম নিরসনের আহবান জানানো হয়েছে। বলা হয় শিশু জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। সেই কারিগরদের বিশাল একটি অংশ অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত, যার কারণ মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের উপস্থিতিতে সৃষ্ট দারিদ্র্য। যে বয়সে একজন শিশুর স্কুলে থাকার কথা ঠিক সে বয়সেই শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে একজন শিশুকে অর্থ উপার্জনের তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে বাধ্য হতে হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অতি অল্প বয়সে এসব কোমলমতি শিশু তাদের শৈশবকে হারিয়ে ফেলে। ফলে এসব শিশুর জীবন বিনা বাধায় বয়স্ক শ্রমিকদের জীবনের স্রোতে মিশে যায়।
শিশুদের শ্রমে নিয়োগে বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির বিপাকে শিশুরা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত হওয়ায় এদের সোনালী ভবিষ্যত্ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। সুশাসনের অভাব, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অনুপস্থিতি, লাগামহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় সৃষ্ট দুষ্টচক্রে বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী অর্থনীতির সুফল পেতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব জনগোষ্ঠীর শহরমুখী অভিবাসন এবং বস্তির অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে শিশুরাই সবচেয়ে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০০৩ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা ৭৪ লাখ। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত ১৩ লাখ শিশু। তবে, এর সংখ্যা যে বর্তমানে বেড়েছে তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। ২০০৩ সালের পর শিশু শ্রমিকের সংখ্যা নির্ণয়ে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো জরিপ পরিচালিত হয়নি। তবে বর্তমানে আইএলওর সহায়তায় জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। সামপ্রতিক সময়ে সরকারি কোন জরিপ না থাকা ও বেসরকারি সংস্থার জরিপেও সংখ্যাগত পার্থক্য থাকায় শ্রমজীবী শিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, নিবন্ধনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গৃহকর্মীদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি তিন শিশু শ্রমিকের মধ্যে দুইজনই গৃহকর্মী।
সরকারের আইএলও কনভেনশন অনুসমর্থনসহ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার রয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনে সরকার ২০১০ সালে নীতিমালা তৈরি করেছে। ‘বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চালু করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। এই প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন স্কুলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি লেখাপড়ার সুযোগ রয়েছে। গৃহকর্মী শিশুর সুরক্ষায় একটি নীতিমালার খসড়া সংশোধন পর্যায়ে রয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের বিধানাবলী বাস্তবায়নে ‘শিশু আইন-২০১৩’ প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছে। তবে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, ব্যাপক নাগরিক সচেতনতা, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের আন্তরিক অংশগ্রহণসহ বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন।
লেখক : ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
ashadullah.bd@gmail.com