সন্ত্রাস বিরোধী আইনের অপব্যবহারের আশংকা

সংশোধিত সন্ত্রাস বিরোধী আইনের কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশের শীর্ষ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এই আইন সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। যেসব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এ সংশোধনী আনা হয়েছে এসব অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট আইন দেশে বিদ্যমান আছে। তারা বলেন, জনগণের নিরাপত্তার জন্য অতীতে জননিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিলো; কিন্তু তখন সেই আইনের মাধ্যমে ঢালাওভাবে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার করেছিলো সরকার। এই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের ফলে অতীতের মতো ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা লংঘনের যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। এছাড়া আইনটিতে পুলিশকে দেয়া হয়েছে অবাধ ক্ষমতা। গত ৩ জুন সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০১৩ সংসদে উত্থাপন করা হয়। মাত্র আট দিনের মধ্যেই সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষার পর মঙ্গলবার বিলটি পাস করা হয়। সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ২০০৯ সালে এ আইনটি প্রথম প্রণয়ন করা হয়। এটা ছিলো অত্যন্ত আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের। আমার কাছে আশ্চর্য লাগে, এ আইনটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাস সংঘটিত হয়েছে। তখন সেখানে এ আইন প্রয়োগ করা হয়নি। অথচ তড়িঘড়ি করে এই আইনের সংশোধনী আনা হয়েছে যাতে ফেসবুক-টুইটারে আলাপ-আলোচনার বিষয় সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা যাবে। সংশোধিত আইনে এটার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরাই জানেন, কেন তারা এই আইনে সংশোধনী আনলো? সিনিয়র আইনজীবী ড. এম জহীর বলেন, যে কোনো জিনিসের (শাঁখের করাত) দুইটি ধার আছে। যেতেও কাটে, আসতেও কাটে। যে আইনটা প্রণয়ন করা হয়েছে সেটা পুলিশের সুবিধার জন্য। এখন এটার অপব্যবহারও হতে পারে। তিনি বলেন, আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে গেলো। তারপর চালান করে দিলো। এরপর ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করবে। তার মানে পুলিশের ওপর ক্ষমতা ছেড়ে দিলো। ‘ইট মে বি ইউজড আরবিট্ররি’। ফেসবুক-টুইটারের আলাপ-আলোচনা সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন প্রসঙ্গে ড. জহীর বলেন, ইন্টারনেটে আপনি তো কোন প্রেসিডেন্টকে গালি দিতে পারেন না। আমেরিকা-ইউরোপের বিরুদ্ধে কিছু লিখে ভিসা নিতে যান তখন দেখুন আপনি ভিসা পাবেন কি না? ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক বলেন, কেউ যদি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, ইন্টারনেট মাধ্যমের এ সংক্রান্ত কথাবার্তা, ছবি ও ভিডিও আদালতের জন্য আমলযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ হওয়াটা দোষের নয়; কিন্তু তার আগেই অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সেই সব কথাবার্তা, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে হবে এবং সেটা তিনি সংগ্রহ করবেন অন্যায়ভাবে। কারণ, সংবিধানের মৌলিক অধ্যায়ের মাধ্যমে ব্যক্তির গোপনীয়তাকে সুরক্ষা দেয়া আছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ আইনের ২১ ধারা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এতে সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদের লংঘন হবে। মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। ঢালাওভাবে এ অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, এ আইন ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক করা কুখ্যাত জননিরাপত্তা আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ওই সময় ঢালাওভাবে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়েছিলো। ড. শাহদীন মালিক বলেন, এই সরকার অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়নি। ওই জননিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের ফলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা মাত্র ৬২টি আসন পেয়েছিলো। এখনো সেই পথে যাচ্ছে সরকার। এবারও ফেসবুক-টুইটারসহ সব যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বলার কারণে ঢালাওভাবে এই আইনের অপব্যবহার হবে। এখানে কোনো সেফগার্ড নেই। পুলিশ মামলা করার বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট পোস্ট বক্স হয়ে যাচ্ছে। সংবিধানে ম্যজিস্ট্রেটের ক্ষমতার কথা রয়েছে। সেখানে বলা আছে, ম্যাজিস্ট্রেট বিচার বিবেচনা করে আদেশ দিবেন; কিন্তু এখন পুলিশ শুধু একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলে হয়ে যাবে। এটাতো আইন সংগত নয়।