চেতনানাশক খাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় পাভেলকে
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৩, ২৩:০৩
জুসের বোতলে তরল চেতনা নাশক মিশিয়ে খাওয়ানো হয় আরিফুল ইসলাম পাভেলকে। পরে পাভেল তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে তার বুকের উপর চেপে বসে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়। ধানমন্ডির ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র পাভেল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তি-মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরে তিন হত্যাকারী জাহাঙ্গীর, ফয়সাল ও ফরহাদকে কারাগারে পাঠানো হয়।
পাভেল গত ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডস্থ বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার হয় জাহাঙ্গীর, ফয়সাল ও ফরহাদ। তাদের দেয়া তথ্যমতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গত বুধবার বিকালে নরসিংদীর রায়পুরার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের কান্দাপাড়া কবরস্থানের পাশে মাটি খুঁড়ে পাভেলের কংকাল উদ্ধার করে। পুলিশ উদ্ধার করেছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত হাজী রুমাল ও পাভেলের ব্যাগ। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (দক্ষিণ) মোখলেছুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের আগ মুহূর্তে পাভেল তার এক বান্ধবীর সঙ্গে প্রায় বিশ মিনিট কথা বলেছিল। ওই সময় পাভেল তার বান্ধবীকে বলেছিল, ‘আমি গ্রামে এসেছি, দুই/এক দিনের মধ্যে ঢাকায় ফিরবো’। আর এই ফোনের সূত্রধরেই গ্রেফতার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পাভেলের বন্ধু জাহাঙ্গীর হোসেনকে। তার দেয়া তথ্যমতে ঢাকা থেকে ফয়সাল ও নরসিংদীর তাওয়াদি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ফরহাদকে।
তিনি বলেন, হত্যার মূল কারণ ১৮ লাখ টাকা। এই টাকা দিয়ে পাভেল একটি ফ্ল্যাট বুকিং দেয়ার পরিকল্পনা করে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে; কিন্তু জাহাঙ্গীর এই টাকা মেরে দেয়ার ফন্দি আটে। জাহাঙ্গীর পাভেলের টাকা দ্বিগুণ করে দেয়ার লোভ দেখায়। টাকা দ্বিগুণ করার নেশায় পাভেল গত ২৬ ডিসেম্বর ব্যাংক থেকে ১৮ লাখ টাকা তুলে একটি কাপড়ের স্কুল ব্যাগে টাকা ভরে। জাহাঙ্গীরের নির্দেশনা মোতাবেক ফয়সাল সুকৌশলে পাভেলকে সঙ্গে নিয়ে ওই দিন ট্রেনযোগে নরসিংদী রেল স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাযোগে খানাবাড়ী নামক স্থানে যায়। এরপর রাত সাড়ে দশটার দিকে ফয়সাল ও ফরহাদ পাভেলকে নিয়ে পায়ে হেঁটে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানাধীন আবিদাবাদ কান্দাপাড়া কবরস্থানে পৌঁছায়। সেখানে আগেই একটি গর্ত খুড়ে রাখে ফরহাদ। সেখানে পৌঁছাবার পর তারা ফ্রুটো জুসের সঙ্গে চেতনা নাশক খাওয়ায়। পাভেল তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীর মোবাইল ফোনে ফরহাদ ও ফয়সালকে বলে, কোন ভাবেই যেন পাভেল বেঁচে না থাকে। ফরহাদ একটি হাজী রুমাল (যা সাধারণত হাজী সাহেবরা গলায় ও পিঠে জড়িয়ে রাখে) দিয়ে পাভেলের নাক-মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে। ফয়সাল পাভেলের দুই পা ও দুই হাত মাটির সঙ্গে চেপে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাভেল মারা যায়। মোবাইল ফোনে বিষয়টি জাহাঙ্গীরকে জানায়। জাহাঙ্গীরের নির্দেশে নিহতের জামা-জুতা পুড়িয়ে ফেলে খুনিরা। পরে পাভেলের লাশ গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। ফরহাদ ও ফয়সাল টাকার ব্যাগ নিয়ে নিকটবর্তী মির্জানগর সাধুর আস্তানায় আশ্রয় নেয়। পরে খুনিরা টাকা এবং মোবাইল ফোন জাহাঙ্গীরকে বুঝিয়ে দেয়। জাহাঙ্গীর এ টাকা হতে ফরহাদকে দুই লাখ ও ফয়সালকে দুই লাখ দেয়। জাহাঙ্গীর পাভেলের ব্যবহূত মোবাইল সেটটি ভেঙ্গে নষ্ট করে ফেলে। এডিসি মোখলেছ জানান, ঘটনার কয়েকদিন পর জাহাঙ্গীর অন্য একটি মোবাইল দিয়ে পাভেলের মাকে এসএমএস করে বলে ‘আমি আমার পছন্দের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি। কিছু দিন পরে চলে আসবো। তুমি চিন্তা করো না’।
এডিসি মোখলেছুর রহমান জানান, আসামিদের মধ্যে ফয়সাল বখাটে যুবক। তার বাসা রাজধানীর আজিমপুর এলাকায়। আর ফরহাদ পেশায় কৃষক। সে জাহাঙ্গীরের গ্রামের। পাভেল নিখোঁজ হওয়ার পর গত ২ জানুয়ারি নিউমার্কেট থানায় পাভেলের মা ছোলেমা আক্তার বাদি হয়ে মামলা করেন। পরে মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা দফতরে ন্যস্ত হয়।