পিরোজপুরে যক্ষ্মা নিরাময়ে ব্র্যাকের ডটস্ পদ্ধতির চিকিত্সা

পিরোজপুর সদর উপজেলার ভাইজোড়া গ্রামের আসলাম সেখের মেয়ে তমা খানম। কতইবা বয়স। ১৫ ছুঁই ছুঁই। এরই মধ্যে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। প্রথমে তো অসুখটার নাম শুনেই তমার প্রাণে বাঁচার আসা ছেড়ে দিয়েছিলেন তার মা-বাবা। দীর্ঘদিন ধরে কাশি ও জ্বর না কমায় তাকে নিয়ে আসা হয় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি করে কয়েকদিন চিকিত্সা করানো হয়। পরীক্ষা করানো হয় কফ। এরপরই ধরা পড়ে যক্ষ্মার জীবাণু। দেহে যক্ষ্মার জীবাণুর উপস্থিতির কথা শোনার পর থেকে তমা শুধু কাঁদতে থাকে আর বাঁচবে না বলে। এ অবস্থায় তমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় হাসপাতালে স্থাপিত ব্র্যাকের ডটস্ সেন্টারে। সেখান থেকে জানানো হয় যক্ষ্মা রোগ কোন মরণব্যাধি নয়। নিয়মিত ওষুধ সেবনে যক্ষ্মা রোগ পুরোটাই ভাল হয়। ব্র্যাকের ৬ মাসের কোর্সের ডটস্ পদ্ধতিতে শুরু হয় তমার চিকিত্সা। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আশায় তমা বিগত ৪ মাস ধরে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে আসছে। যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত পিরোজপুর সদর উপজেলার হুলারহাটের সেলিম তালুকদার (৩৭), ভাইজোড়া গ্রামের সুলতান আহম্মেদ (৭০), আলামকাঠী গ্রামের রুস্তম আলীর স্ত্রী ফজিলা খাতুন (৪০), কৃষ্ণনগর গ্রামের আবুল বাসারের স্ত্রী বকুল বেগম (৬৫), পৌর শহরের শাহজাহান সেখ (৪৫)। তারা সকলেই ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় ডটস্ পদ্ধতিতে চিকিত্সা নিচ্ছেন। ব্র্যাক পিরোজপুর অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালে পিরোজপুরে ব্র্যাক যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তারা স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে একত্রিত হয়ে পিরোজপুর থেকে যক্ষ্মা রোগ নির্মূলে কাজ করে চলছে। জেলার ৭টি উপজেলায় বর্তমানে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত চিকিত্সাধীন রোগীর সংখ্যা ৮৭২ জন। যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ এবং রোগীদের কফ পরীক্ষাসহ রোগীদের চিকিত্সার জন্য জেলায় ব্র্যাকের ৮৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৮৭৩ জন স্বাস্থ্য সেবিকা নিয়মিত কাজ করে চলছেন। জেলায় ব্র্যাকের রয়েছে ১১টি ল্যাবরেটরি এবং প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১টি করে ডট্স কর্নার। পিরোজপুরে ব্র্যাক যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ২০১০ সালে ৯৬৮ জন, ২০১১ সালে ৮৯৫ জন, এবং ২০১২ সালে ১১৫১ জন যক্ষ্মা রোগীকে বিনামূল্যে চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। তারা বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে রোগী শনাক্তকরণ এবং কফ পরীক্ষায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্র্যাকের এ কার্যক্রমে গ্রাম্য ডাক্তার, কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকের সিএইচসিপিসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ইউনিয়ন হেলথ কর্মীরাও সহায়তা করে চলছেন। নাজিরপুর উপজেলার শেখমাটিয়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মোহনা খানম জানান, ক্লিনিকে আসা রোগীদের তিন সপ্তাহের বেশি কাশি হলেই তাদেরকে কফ পরীক্ষার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থিত ব্র্যাকের ডট্স কর্নারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চলতি বছর এ পর্যন্ত ছয়জন যক্ষ্মা রোগীকে চিকিত্সার জন্য ব্র্যাকের ডট্স কর্নারে পাঠানো হয়েছে। রোগীদের চিকিত্সা সেবা দেয়ার পাশাপাশি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্র্যাক সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গ্রাম্য ডাক্তারসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনকে নিয়ে সভা-সমাবেশ, মত বিনিময় সভা, গোল টেবিল বৈঠক, সেমিনারের আয়োজন করে চলছে। পিরোজপুর সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আব্দুল গনি জানান, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক কাজ করে চলছে। মাঠপর্যায়ে ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক যক্ষ্মা রোগী ধরা পড়ে। এতে করে শুরুতেই তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে। ব্র্যাকের কর্মসূচি সংগঠক দীলিপ কুমার দাস জানান, মাইক্রোব্যাকটরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামক জীবাণু দিয়ে যক্ষ্মা রোগ হয়। আর যক্ষ্মা রোগের লক্ষণগুলো হচ্ছে: একনাগাড়ে তিন সপ্তাহ বা তার অধিক সময় পর্যন্ত্ত কাশি থাকা, সন্ধ্যায় বা রাতে জ্বর আসা, ক্ষুধা কমতে থাকা, শরীরের ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা হওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং কফের সাথে রক্ত বের হওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সন্দেহজনক রোগীদের কফ সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেলে প্রতিবেদনসহ রোগীকে সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকের কাছে পাঠানো হয়। চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকাদের মাধ্যমে রোগীর বাড়িতে বসেই ডট্স পদ্ধতিতে যক্ষ্মা রোগের চিকিত্সা করানো হয়। ব্র্যাকের পিরোজপুর জেলা প্রতিনিধি মোঃ ফিরোজ ভূইয়া জানান, পিরোজপুরে ব্র্যাক অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করে চলছে। ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবিকারা যক্ষ্মা রোগী নির্ণয়ে মাঠপর্যায়ে থেকে নিয়মিত কাজ করছেন। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মোতাবেক ব্র্যাক যক্ষ্মা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।