বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রায় বাধা-বিপত্তি
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৩, ২১:৪৬
ইতিপূর্বে অনেকবার বলেছি গণতন্ত্র রক্ষার কথা। কিন্তু আজ একটু অন্য কথা বলি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যাত্রায় বাধা-বিপত্তি এবং হতাশা খুবই সাধারণ বিষয়। প্রায়ই যে কথাটি আমরা শুনি তাহলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র হুমকির মুখে। পত্রিকা খুললেই গণতন্ত্র-বিরোধী নানাবিধ কর্মকাণ্ডের খবর নতুন নয়। তবে একথা সত্য যে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও কোনো রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই বক্তব্যের পেছনে যুক্তি ও উদাহরণের অভাব হবে না কারণ, জাতীয় সংসদের অকার্যকারিতা, আইনের শাসনের অভাব, বিচার বিভাগে রাজনীতিকীকরণ প্রভৃতি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যেহেতু বিশেষ কোনো একটি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, সেহেতু বিশ্লেষকরা যথাযথভাবেই দাবি করেন যে এগুলো দেশের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খুব সহজেই গণতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের তফাত বুঝতে হলে বলতে হয়, যে শাসন ব্যবস্থায় সরকার জনগণকে ভয় পায় সেটা গণতন্ত্র আর যেখানে জনগণ সরকারকে ভয় পায় সেটাই স্বৈরতন্ত্র। দেশে অব্যাহত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং এ ধরনের কাজে যুক্ত অপরাধীদের দায় থেকে অব্যাহতি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের দুর্বলতার একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষণও বটে। বিগত চারটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮) সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সহিংসতার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রকে সহজেই অনুধাবন করা যায়। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফ্রিডম হাউজ ও বিশ্বব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণতন্ত্রের মানদণ্ডের স্কোর অত্যন্ত নিম্নমানের। বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সরকারের শেষ বছরে এসে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে রাজনৈতিক মতবিরোধ কিংবা সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা কিংবা অধিষ্ঠিত হওয়া প্রশ্নে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার সংকট তীব্র হয়। এক্ষেত্রে নানাবিধ সহিংসতা, সংঘাত ও সংকটের মাত্রাও তীব্র হয়। রাজনৈতিক বিরোধিতার সূত্র ধরে বাংলাদেশে হত্যা-নির্যাতনের মাত্রা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
দার্শনিক প্লেটো ন্যায়বিচার সম্পর্কে বলেছেন, শাসক যেখানে ন্যায়পরায়ণ, আইন সেখানে অনাবশ্যক, আবার শাসক যেখানে দুর্নীতিপরায়ণ, আইন সেখানে নিরর্থক। এ উক্তি থেকে মোটামুটি ধারণা করা যায় যে, গণতন্ত্র কিংবা অন্য যেকোনো শাসন ব্যবস্থা সেটাই বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে সরকার কিংবা শাসকের প্রকৃতি। শাসকের প্রকৃতি প্রশ্নে দুই একটি ইতিহাসই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ যে গণতন্ত্রকাঙ্ক্ষী এ বিষয়ে সংশয় থাকার কোনো কারণ নেই। এ দেশের গণতন্ত্রকাঙ্ক্ষী মানুষের অধিকারের প্রতি পাকিস্তানি শাসকরা সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে কমপক্ষে তিনটি সুস্পষ্ট সূচক এই গণতন্ত্রাকাঙ্ক্ষার প্রমাণ বহন করে: অসংখ্য রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সময় গণআন্দোলন এবং জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণ। এই আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট অব্যাহত রয়েছে বলেই আমরা একমত হতে পারি।
নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের বিভিন্ন ধরন সংক্রান্ত আলোচনা ও তাদের পার্থক্য বিবেচনা করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রায়ই ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’ (Electoral Democracy) বলে বর্ণনা করা হয়ে থকে। এই বর্ণনা ১৯৯১ পরবর্তী সব নির্বাচিত সরকারের শাসনকেই বোঝায়। এটা এই অর্থে সঠিক যে, ১৯৯১-পরবর্তীকালে (একটি ব্যতিক্রম বাদে) নিয়মিতভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এই সময়ের শাসন ব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী সেনাশাসন (১৯৭৫-৯০) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আলী রিয়াজ গণতন্ত্র সম্পর্কে লেখা তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, সব সরকারই নাগরিক অধিকার সীমিত করতে আইনি ও আইন বহির্ভূত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাছাড়া জবাবদিহির বিষয়টি এখনো ‘সোনার হরিণ’ই থেকে গেছে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যু রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশে এ কয়টি রাজনৈতিক দলই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন সময়। নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া যায় আগামী দিনেও এ দলগুলোর মধ্য থেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ আদৌ কী গণতন্ত্রের পথে নাকি উল্টো পথে। এ উত্তর একটু কঠিন হলেও বাস্তবতা বিশ্লেষণে খুব কঠিন নয়।
সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জণগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানের এমন চেতনার হাত ধরে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দেশে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের দুর্বলতার সুযোগে রাজনীতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে বার বার। গণতন্ত্রের অপমৃত্যুর দিকে দেশ ধাবিত হোক এটা দেশের কোনো নাগরিক কিংবা রাজনৈতিক দলের জন্য কাম্য নয়। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। এই মুহূর্তে সরকার ও বিরোধীদলের উভয়েরই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে ও নির্বাচনপূর্ব দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের স্বার্থে রাজনৈতিক ছাড় দেয়ার মানসিকতার মাধ্যমে বিশেষ নজির স্থাপন করা উচিত। এক্ষেত্রে সরকারের দাায়িত্ব যেমন নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা, অন্যদিকে বিরোধীদলও বিরোধিতার নামে বিরোধিতা না করে সংলাপ, আলোচনা বা সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ’৯০ পরবর্তী বেশিরভাগ সরকারের মেয়াদের শেষে এসে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে এক উত্তেজনাকর পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সরকারের মেয়াদের শেষে এমন সমস্যার পুনরাবৃত্তি গোটা জাতিকে গণতন্ত্রের প্রশ্নে আবদ্ধ করে তোলে। এমন পুনরাবৃত্তি রোধে স্থায়ী সমাধান আমাদের সবারই কাম্য। কাজেই সবশেষে একথা বলা যায় যে, যে গণতন্ত্র জনগণের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না, যে গণতন্ত্র নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে ঐক্যে পৌঁছাতে পারে না সে গণতন্ত্র দরকার নেই।
লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Email: sultanmahmud.rana@gmail.com