পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৩, ২২:৫৪
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আজ শনিবার রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন একযোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হবে বলে আশা করেছেন। শান্তি বিঘ্নের যে কোনো পদক্ষেপ কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে হওয়া এই নির্বাচন সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্ববহ।
যে কারণে আজ সারাদেশের দৃষ্টি থাকছে এই চার সিটি কর্পোরেশনের দিকে। সরকার কিংবা বিরোধী জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর কেবল জয়-পরাজয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই নির্বাচন। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ফলাফলের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। নির্ভর করছে সরকার বিরোধী আন্দোলনের গতিপথও। বহুমাত্রিক গুরুত্ববাহী এই নির্বাচনের সারমর্ম-কী হবে তা জানা যাবে আজই।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সরকার ও বিরোধী দল সমর্থক প্রার্থীদের মধ্যে চার সিটিতেই তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সরকার সমর্থক চার প্রার্থীই বিগত দিনে মেয়র পদে ছিলেন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাদের পক্ষে ‘প্রত্যাবর্তনের’ শ্লোগান উঠেছে। অন্যদিকে দুর্নীতি ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু তুলে বিরোধী দলের প্রার্থীদের সমর্থকরা ‘পরিবর্তনের’ আওয়াজ তুলেছেন।
চার সিটিতেই তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। বহিরাগত ঠেকাতে প্রতিটি মোড়ে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। ঢাকায় বসে চার কমিশনার পৃথক চার সিটির সার্বিক পরিস্থিতি মনিটর করবেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে তারা সরকারের বিরুদ্ধে কারচুপির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সরকারি দলের নেতারা। তারা বলেছেন, জনরায়ের উপর সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
চার সিটিতে নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী এলাকায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। চার সিটিতেই (সড়ক-মহাসড়ক ছাড়া) যানবাহন চলাচলের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকালে প্রেরিত নির্বাচন কমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইন-শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিরপেক্ষ ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। ১২ হাজার ৮০ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাকে নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬৫৩ জন প্রিজাইডিং অফিসার, তিন হাজার ৮০৯ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং সাত হাজার ৬১৮ জন পোলিং অফিসার। ভোটারগণ যাতে মোবাইল ফোনে এসএমএসএর মাধ্যমে তাদের ভোটার নম্বর ও কেন্দ্রের নাম জানতে পারে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উচ্চ চাপ ও তাপের নির্বাচন
নির্বাচনকে পর্যবেক্ষকরা স্মরণকালের উচ্চ চাপ ও তাপের নির্বাচন বলে মনে করছেন। নির্বাচন নির্দলীয় হলেও সরকারি ও বিরোধী দলের দলগত আচরণ এবং ভূমিকার কারণে কার্যত এটি দলীয় নির্বাচনে রূপ নিয়েছে। এ নির্বাচনের ফলাফলের উপর আগামী রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করবে। বিরোধী দল পরাজিত হলে অথবা নির্বাচনে কারচুপির শিকার হলে এই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় এই অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামবে। অন্যদিকে বিজয়ী হলে এই সরকারের কোন জনপ্রিয়তা নেই, এই বক্তব্য দিয়ে সরকারের পদত্যাগের দাবি জানাবে। সরকারি দল জয়ী হলে তাদের জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রয়েছে এই আওয়াজ তুলবে। আবার পরাজিত হলে তাদের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব এমন বক্তব্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নাকচ করে দিবে। রাজনীতির এই খেলাধুলায় চার সিটির নির্বাচনে উচ্চ তাপ তৈরি হয়েছে।
সতর্ক আইন-শৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসন
বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া উত্সবমুখর পরিবেশে প্রচারণা কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। গতকালই প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছে রিটার্নিং অফিসার ব্যালট পেপারসহ ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করেছেন। প্রার্থীরা ব্যস্ত ছিলেন শেষ মুহূর্তের কৌশল, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং এজেন্টদের নিয়োগপত্র বিলি নিয়ে। চার সিটির পৃথক চার কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন। চার সিটিতে র্যাবের ৬০ টি দল ( প্রতি দলে ৮ থেকে ১০ জন), ২১ প্লাটুন বিজিবি এবং খুলনা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ৫ প্লাটুন কোস্টগার্ড নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটেলিয়ান আনসারের সমন্বয়ে ১৫৮টি ভ্রাম্যমাণ এবং স্ট্রাইকিং দল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। র্যাবের ওই ৬০টি দলকে জরুরি কোন প্রয়োজনে সহায়তা দেয়ার জন্য আরো ১৫টি দল প্রস্তুত থাকবে। প্রতিটি সিটিতে র্যাবের ৫০ জন করে গোয়েন্দা নিয়োজিত থাকছে।
নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোট কেন্দ্র সমহের ঝুঁকি বিবেচনা করে সাধারণ ও গুরুত্বপর্ণ হিসেবে ভাগ করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ২২ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্রে ২৪ জন আইন-শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। ভোট গ্রহণের পর্ববর্তী দুইদিন, ভোট গ্রহণের দিন এবং ভোট গ্রহণের পরবর্তী দুইদিন ভোট কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইন-শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। প্রতি ওয়ার্ডের জন্য একটি মোবাইল ফোর্স ও তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। চার সিটি কর্পোরেশনে ১১৮টি মোবাইল এবং ৪০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োজিত থাকবে।
এছাড়া নির্বাচনী এলাকায় মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সাথে ৯১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনী অপরাধীদের তাত্ক্ষণিক বিচারের জন্য প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে ৫ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত হচ্ছে খুলনা সিটি কর্পোরেশনে। এ সিটির নিরাপত্তায় পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটেলিয়ান আনসারের ৩১ টি ভ্রাম্যমাণ এবং ১১টি স্ট্রাইকিং দল, র্যাবের স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ১৬টি দল, ৭ প্লাটুন বিজিবি এবং ৩ প্লাটুন কোস্টগার্ড থাকবে।
মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক
চার সিটিতে মোট ১২ জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া মোট ১১৮টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৫৪২ ও ৩৯টি সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ১৯১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজশাহীতে সদ্য বিদায়ী মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (তালা), মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (আনারস) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান (চশমা), খুলনায় সদ্য বিদায়ী মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক (তালা), বিএনপির সদ্য পদত্যাগী জেলা সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি (আনারস) ও জাতীয় পার্টি (এ) জেলা সভাপতি শফিকুল ইসলাম মধু (দোয়াত কলম), বরিশালে ১৪ দল সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটি সমর্থিত ও সদ্য বিদায়ী মেয়র শওকত হোসেন হিরন (টেলিভিশন), ১৮ দল সমর্থিত জাতীয়তাবাদী নাগরিক পরিষদের আহসান হাবীব কামাল (আনারস) ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুন (দোয়াত কলম) এবং সিলেটে সদ্য বিদায়ী মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান (আনারস), বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী (টেলিভিশন) ও সতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন রিমন (তালা) প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ভোটার ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার তালিকানুযায়ী রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৭ জন ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৫ জন। আর নারী ভোটার ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫২২ জন। ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩০টি। ১৩৭টি কেন্দ্রে ভোটকক্ষ ৮৭১টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষ আছে ১০৭টি। এর মধ্যে ১০৪টি কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
খুলনা সিটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৬৫৬ জন। আর ওয়ার্ড সংখ্যা ৩১টি। এখানে ভোটকেন্দ্র ২৮৮টি, স্থায়ী ভোটকক্ষ ১ হাজার ৪২৮টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষ ৩৩টি। এ সিটিতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২০২টি। এর আগে ২৩৯ কেন্দ্রের মধ্যে এ সংখ্যা ছিল ১৯৫টি।
বরিশাল সিটিতে ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৯৩৯ জন। এ সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩০টি। এখানে কেন্দ্রের সংখ্যা ১০০টি, স্থায়ী ভোটকক্ষ ৬১৪টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষের সংখ্যা ৩৭টি। এ সিটিতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ৬০টি।
সিলেট সিটিতে ভোটার ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৭ জন। আর ওয়ার্ডের সংখ্যা ২৭টি। মোট কেন্দ্র ১২৮টি। স্থায়ী ভোটকক্ষের সংখ্যা ৮৯৬টি এবং অস্থায়ী কক্ষের সংখ্যা ১১টি। এ সিটিতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৬২টি।
সহিংসতার আশংকা
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর সহিংসতার আশংকা প্রকাশ করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনে বিরোধী দল পরাজিত হলে নাশকতা ও অপতত্পরতা চালাতে পারে। তবে এ ধরনের তথ্য উপস্থাপনের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। এছাড়া নির্বাচনোত্তর বিজয়ী মিছিলের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মনিটরিং করছেন চার কমিশনার
চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পৃথকভাবে মনিটরিং করার দায়িত্ব পালন করছেন চার নির্বাচন কমিশনার। এদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক খুলনার, মোহাম্মদ আবু হাফিজ রাজশাহীর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোঃ জাবেদ আলী বরিশালের ও মোঃ শাহ নেওয়াজ সিলেটের পরিস্থিতি মনিটরিং করছেন। ঢাকায় বসেই তারা সার্বিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
পর্যবেক্ষকদের সতর্ক দৃষ্টি
পর্যবেক্ষণের জন্য দেশি ও বিদেশি অনেক পর্যবেক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করা হয়েছে। দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণরত সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে- সুজন, অধিকার, জানিপপ।