টেরেশকোভা প্রথম নারী মহাকাশচারী

১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল মানুষের মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন সফল হয় ইউরি গ্যাগারিনের প্রথম মহাকাশ যাত্রার মধ্য দিয়ে। এরপর সে সময়ের সোভিয়েট ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক নভ’চরকে মহাকাশে পাঠিয়ে মহাশূন্যে নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। এরপর আসল সেই দিনটা, যেদিন বিশ্ববাসী বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করল মহাকাশ হয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও পিছিয়ে নেই। আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে ভোস্টক-৬ মহাকাশযানে মহাশূন্যে পাড়ি দিয়ে ভ্যালেন্টিনা ভ্লাদিমিরভনা টেরেশকোভা বিশ্বের প্রথম নারী মহাকাশচারী হিসেবে নিজের নাম লিখান ইতিহাসের পাতায়। ১৯৩৭-এর ৬ মার্চ মধ্য রাশিয়ার টুটায়েভস্কি জেলার মাসলেন্নিকোভো গ্রামে টেরেশকোভা পৃথিবীর আলো দেখেন। তার বাবা-মা বেলারুশ থেকে রাশিয়ায় চলে আসেন। বাবা ছিলেন একজন ট্রাক্টর চালক ও মা বস্ত্রকল কর্মী। ১৯৪৫-এ ৮ বছর বয়সে স্কুলে টেরেশকোভার পড়াশোনা শুরু হলেও ১৯৫৩-এ তিনি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে করেসপন্ডেন্স কোর্সে তার শিক্ষা চালিয়ে যান। তরুণ বয়সে স্থানীয় বিমান চালনা ক্লাবে স্কাইডাইভিং বা প্যারাসুট ঝাঁপের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৯-এর ২১ মে ২২ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার আকাশ থেকে ঝাঁপ দেন। সে সময় তিনি স্থানীয় একটি কারখানায় টেক্সটাইল কর্মীর কাজ করতেন। স্কাইডাইভিং-এ দক্ষতার জন্যই তাকে Cosmonaut হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এজন্য যেসব যোগ্যতার দরকার হত তার মধ্যে আছে তাকে ৩০ বছরের নিচে একজন প্যারাস্যুটিস্ট হতে হবে। উচ্চতা হবে ১৭০ সে.মি. (৫ ফুট ৭ ইঞ্চি) এবং ওজন থাকতে হবে ৭০ কেজির নিচে। টেরেশকোভাকে বিশেষ করে একজন যোগ্যতম প্রার্থী নির্বাচিত করা হয় কার্যত তিনি শ্রমজীবী পরিবার থেকে এসেছিলেন এবং তার পিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্যাংক লিডার ভ্লাদিমির টেরেশকোভা একজন যুদ্ধবীর ছিলেন বলে। বিশ্বযুদ্ধের সময় রুশ-থিনল্যান্ড সীমানের লেমেট্রি এলাকায় তিনি নিহত হন। সে সময় টেরেশকোভার বয়স মাত্র ২ বছর। মহাকাশ জয় করে ফিরে আসলে সোভিয়েট সরকার তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল স্বদেশের প্রতি তার অবদানের জন্য সোভিয়েট ইউনিয়ন কিভাবে তাকে ধন্যবাদ জানাবে। টেরেশকোভা বলেছিলেন, তার পিতা রণাঙ্গনের ঠিক যেখানে নিহত হন যে জায়গাটা খুঁজে বের করে যেন সব তথ্য প্রকাশ করা হয়। টেরেশকোভার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছিল। রুশ-ফিনিশ সীমান্তর রুশ অংশে এখন তার পিতার একটি স্মৃতিসৌধ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৬২’র ১৬ ফেব্রুয়ারি টেরেশকোভা নারী মহাকাশচারী দলের জন্য নির্বাচিত হন। ৪ শতাধিক আবেদনকারীর মধ্যে ৫ জনকে বাছাই করা হয়। তারা হলেন:তাতিয়ানা কুজনেতসোভা, ইরিনা সলোভিয়োভা, সান্না ইয়র্কিনা, ভ্যালেন্টিনা পনোমারিয়েভনা ও টেরেশকোভা। ১৯৬৩’র ১৪ জুন ভোস্টক ৫-এর সফল উেক্ষপণের পর টেরেশকোভা তার নিজের ফ্ল্যাইটের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তার বয়স তখন ২৬। ১৬ জুন সকালে টেরেশকোভা ও তার স্ট্যান্ডবাই সলোভিয়োভা স্পেসস্যুটে সুজ্জিত হয়ে বাসে করে উেক্ষপণ মঞ্চের দিকে রওনা হন। ২ ঘণ্টাব্যাপী কাউন্টডাউনের পর ভোস্টক-৬কে নিখুঁতভাবে মহাশূন্যে পাঠানো হয়। মহাশূন্য থেকে তার প্রথম call-sign (প্রথম বার্তা) ছিল চাইকা বা শঙ্খচিল। বমি বমি ভাব ও শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করলেও তিনি ৪৮ বার পৃথিবী পরিক্রমণ করে মহাশূন্যে ৩ দিন অবস্থান করেন। মহাশূন্য থেকে তিনি দিগন্তের অনেক আলোকচিত্র গ্রহণ করেন যা বায়ুমণ্ডলে এয়ারোসোলের স্তর শনাক্ত করার পরীক্ষায় কাজে লাগে। টেরেশকোভা ‘সোভিয়েট ইউনিয়নের বীর’ পদক ছাড়াও দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯০তে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানজনক ডক্টরেট দিয়ে সম্মানিত করে। ২০০৭-এ ৭০তম জন্মদিন পালন অনুষ্ঠানে সে সময়ের রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুটিন তার বাসভবনে তাকে আমন্ত্রণ জানান। টেরেশকোভা ১৬৬৩’র ৩ নভেম্বর সহকর্মী মহাশূন্যচারী আন্দ্রিয়ান নিকোলায়েভের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তার মেয়ে এলেনার জন্ম হয় ১৯৬৪’র ৮ জুন। এলেনা একজন ডাক্তার। এই সেদিন এই বীর নারী বলেছেন, ‘মঙ্গল হল আমার প্রিয় গ্রহ। কিন্তু আমরা মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা জানি। মঙ্গল জয়ের স্বপ্ন এখনো অধরা রয়ে গেছে। সেটা হয়তো একমুখী যাত্রা হবে তবুও আমি সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি’ একজন বীরাঙ্গনা নারীর যোগ্য উক্তিই বটে! নজরুল যথাযথই বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ লেখক : সাংবাদিক