খুলনায় শান্তিপূর্ণ ভোট
সাইদুর রহমান, রেজাউল করিম ও এনামুল হক, খুলনা থেকে
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৩, ২৩:২১
র্যাব-পুলিশের মৃদু লাঠিচার্জ, একজন শ্রমিকের মৃত্যুসহ বিছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নগরীর ২৮৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহন করা হয়। সকালের দিকে কেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারের উপস্থিতি বাড়লেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ক্রিসেন্ট জুট মিলস গেইটে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী আলম সরদার নামে এক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে নগরীতে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
গতকাল দিনের প্রথমার্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী তিন মেয়র প্রার্থী ভোটগ্রহন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। কিন্তু ভোটগ্রহন শেষে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি কয়েকটি কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া এবং একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ করেন। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন তিনি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের এবারের নির্বাচনে ভোটার মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৬ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২৪ হাজার ৫০৪ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ৬২ জন। নির্বাচনে মেয়র পদে তিনজন, সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনে ৪৫ জন ও ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরা হলেন-আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির তালুকদার আব্দুল খালেক (প্রতীক তালা), বিএনপি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মনিরুজ্জামান মনি (প্রতীক আনারস) এবং জাতীয় পার্টি সমর্থিত খুলনা নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির শফিকুল ইসলাম মধু (প্রতীক দোয়াত-কলম)।
যেভাবে শ্রমিকের মৃত্যু
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ক্রিসেন্ট জুট মিল গেইটের সামনে ২০ থেকে ৩০ জন ইসলামী আন্দোলনে কর্মী ও মিলের শ্রমিক ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সামসুল আলমের চাঁদ প্রতীকের সমর্থনে উচ্চস্বরে ‘জিকির’ করছিল। এ সময় র্যাবের একটি টিম ধাওয়া দিলে আলম সরদার (৪৫) নামে এক শ্রমিক রেল লাইনের উপর ছিটকে পড়ে বুকে আঘাত পান। পুলিশ সেখান থেকে ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক আলম সরদার, মোফাজ্জেল মল্লিক, জামাল, ইউসুফ, জসিম, আব্দুল খালেক, সোহরাব হোসেন, খলিল ও ফরিদকে আটক করে। এদের মধ্যে আলম সরদার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। অসুস্থ অবস্থায় আলম বাসায় ফিরলে প্রথমে তাকে ক্রিসেন্ট জুট মিল হাসপাতালে ও পরে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, সেখানে তিনি মারা যান।
আটক অন্য শ্রমিকদের খালিশপুর থানা থেকে ছাড়িয়ে নেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান।
এদিকে আলম সরদারের মৃত্যুর খবর ক্রিসেন্ট জুট মিলের আলিম মাদ্রাসা-লিল্লাহ বোর্ডিং কেন্দ্রে পৌঁছালে সেখানে অবস্থানরত ভোটারদের মধ্যে উত্তেজনা ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির কারণে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
মনির যত অভিযোগ
খবর পেয়ে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ঘটনাস্থলে যান। এ সময় মনিরুজ্জামান মনি অভিযোগ করে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে একজন মানুষের মৃত্যু ন্যক্কারজনক ঘটনা। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কয়েকটি কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। নগরীর বঙ্গবাসী স্কুল কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের বিরুদ্ধে একজন ভোটারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে ‘তালা’ প্রতীকে সিল মারার অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়াও তিনি পিটিআই স্কুল কেন্দ্রে ও সিটি কলেজ কেন্দ্রে সরকারি দল ও পুলিশ তার সমর্থকদের হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করেন।
খালেকের প্রধান এজেন্ট যা বললেন
মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মিজানুর রহমান বলেন, মিল শ্রমিক আলম হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। একটি স্বাভাবিক মৃত্যুকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ও তার লোকজন অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, কোন কেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেনি। নিশ্চিত পরাজয় জেনেই তারা এই অপপ্রচার শুরু করেছে।
পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পুত্রের
শ্রমিক আলম সরদারকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার ছেলে আল আমিন। তিনি বলেন, ‘সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর শুনেছি, আমার আব্বাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সেখানে তাকে পিটিয়েছে। পুলিশ ছেড়ে দেয়ার পর তিনি বাসায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নগরীর বেসরকারি সার্জিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনি মারা যান।’ তবে আলম সরদারের সহকর্মী ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক যুবলীগ এবং স্থানীয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আলম সরদার স্ট্রোকে মারা গেছেন। তাকে মারপিটের কথা সত্য নয়।’ একই কথা দাবি করেন আলমের মামা আব্দুস সাত্তার হাওলাদার।
অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ
এ বিষয়ে ক্রিসেন্ট আলিম মাদ্রাসা-লিল্লাহ বোর্ডিং কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের এএসপি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আলমকে নির্যাতনের অভিযোগ সত্য নয়। আলম হূদরোগে আক্রান্ত মারা গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
র্যাব-৬ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদাচ্ছের হোসেন জানান, বেলা সাড়ে ১০টার দিকে এক কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা দলবদ্ধ হয়ে মিছিল করা চেষ্টা করছিল। এ সময়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। সেখান থেকে ৮ ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পরে আটকদের খালিশপুর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, আলম সরদার হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
আলম সরদার ক্রিসেন্ট জুট মিলের ফিনিশিং বিভাগে সরদার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার ষটিখোলা গ্রামের সৈয়দ আলী শেখের ছেলে। তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্রিসেন্ট জুট মিল জামে মসজিদের সামনে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ করে।
ভোটকেন্দ্রের সদরে-অন্দরে
সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া গতকাল নগরীর ২৮৮টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। নির্বাচনে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। নগরীর এপিসি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র, বিকে ইউনিয়ন ইনস্টিটিউট কেন্দ্র, আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র, পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল কেন্দ্র, ইকবাল নগর বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র, সরকারি সিটি কলেজ কেন্দ্র, হাজেরা মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, শেরে বাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কেন্দ্র ঘুরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলতে দেখা গেছে।
এবার ২০২টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ ও ৮৬টি কেন্দ্রকে সাধারণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ২২ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয় সমগ্র মহানগরীতে। ভৈরব ও রূপসা নদীতে দিনভর টহল দেয় কোস্টগার্ডের দু’টি ইউনিট। এসব কাজে সহযোগিতা করতে দায়িত্ব পালন করেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পাঁচজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। নির্বাচনে ২৮৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার, এক হাজার ৪২৮ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং দুই হাজার ৮৫৬ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করেন।
তিন মেয়র প্রার্থীর ভোটদান পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে পাইওনিয়ার মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। ভোটদান শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। কোথাও কোনো কারচুপি হবে না।
মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি সকাল সাড়ে ৮টায় খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে তিনি ভোট দেন। ভোট দান শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সবেমাত্র ভোটদান শুরু হয়েছে। তবে শুরুটা ভালো হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত ভোট কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা ভালো।
জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সফিকুল ইসলাম মধু নগরীর সোনাডাংগার খুলনা কয়েজিয়েট স্কুল কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেছেন। বিকালে এক প্রতিক্রিয়ায় মধু জানান, নির্বাচনের শুরু থেকে দুই প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পাশাপাশি আমাকে প্রশাসনের মোকাবিলা করতে হয়েছে।