[ আ লো ক পা ত ]
অসম বিকাশের সূত্র : জাতিগত ও শ্রেণিগত ইস্যুর সমন্বয়
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৩, ২২:১৯
বৃহত্তর মানব সমাজ হলো একটি অখণ্ড সত্তা। কিন্তু কালের বিবর্তনে তার বিভিন্ন অংশ বিকশিত হয়েছে অসম মাত্রায়। বিকাশের মাত্রার তারতম্য হলো মানব সমাজের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। যে সময় থেকে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ এবং সেই সূত্রে সমাজে শ্রেণিবিভাজন শুরু, তখন থেকেই সমাজে অসম বিকাশের এই সূত্র কার্যকর রয়েছে। সমাজ বিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যজনিত কারণেই এমনটি ঘটেছে। ফলে সমগ্র মানব সমাজের কোনো একটি অংশ অন্যদের তুলনায় এগিয়ে গেছে, কোনোটা আবার পিছিয়ে পড়েছে। ভাঙ্গা-গড়ার ঐতিহাসিক নানা অধ্যায়ের নানা ঘটনা, এগিয়ে থাকা একটি জাতিকে কখনো পেছনে ঠেলে দিয়েছে আবার পিছিয়ে পড়া অন্য কোনো জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এভাবেই বৃহত্তর মানব সমাজে এগিয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে জাতিগত বৈষম্য স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। জাতিগত অসম বিকাশ ও বৈষম্য হলো বর্তমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র।
অনুরূপভাবে, সমাজ ব্যবস্থার অসম বিকাশের সূত্রের কারণেই একই জাতির ভেতরে ব্যক্তিগতভাবে সমাজের কেউ-কেউ অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাদের এই এগিয়ে যেতে পারাটা তাদেরকে আরো এক ধাপ বেশি মাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার পথে বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে। ফলে, বড় আরো বড় হয়েছে, আর ছোট হয়েছে আরো ছোট। এভাবে একই জাতির ভেতর শ্রেণিবিভাজন ও শ্রেণি-বৈষম্য তীব্র হয়েছে। পুুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার কারণে আমাদেরকে এখনো জাতি হিসেবে একটি বৈষম্যের দুনিয়ায় ও একই সাথে শ্রেণি হিসেবে একটি বৈষম্যের সমাজে বাস করতে হচ্ছে।
তবে, এই অবস্থা যে চিরস্থায়ী হবে তার সম্ভাবনা নেই। কারণ, যেসব বাস্তবতা জাতিতে-জাতিতে এবং একটি জাতির অভ্যন্তরে এই বৈষম্যের ধারা তৈরি করে সে সবের, তথা শোষণ প্রক্রিয়ার অবসান হলেই জাতিগত ও শ্রেণিগত বৈষম্য দূর হয়ে সাম্যের বিশ্ব ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ প্রচলিত শোষণ ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর বাস্তব পূর্বশর্তের জন্ম দেয়া যুগ-যুগের বৈষম্যের অবসানের বিষয়টি আজ বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে উঠেছে। তবে কাজটি যে কঠিন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটি একটি সহজ-সরল ও সোজা-সাপ্টা কাজ অবশ্য নয়। আঁকা-বাঁকা পথে, চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে, ‘এক পা আগে আর দু’পা পিছে’ করতে করতে মানব সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে শোষণ-বৈষম্যহীন সভ্যতার দিকে। পৃথিবীর একেক দেশ-জাতি আর নিজস্ব সমাজ বাস্তবতা অনুসারে আপন-আপন পথ ধরে সেই লক্ষ্যাভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। চলার পথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রার ধারা অবশ্য সাময়িকভাবে উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে ও সাম্য-ভ্রাতৃত্বের জন্য মানব সমাজের এই সংগ্রাম হলো মানবমুক্তির একটি বিশ্বজনীন সংগ্রাম। মানব সমাজের একটি অংশকে শোষণ-বৈষম্যের কারাগারে আবদ্ধ রেখে তারই অপর অংশের মুক্তি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশ হতে পারে না। ‘মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হলো একটি বিশ্বজনীন সর্বমানবিক সংগ্রাম। এ সংগ্রামের মূল চরিত্র আন্তর্জাতিক ও সর্বমানবিক। কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট রূপটি হলো জাতীয়। প্রতিটি জাতিকে তার নিজের শক্তিতে ও নিজের মতো করে শোষণ-বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে বের হওয়ার পথ করে নিতে হবে। অন্যান্য জাতির সমর্থন ও সংহতির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও, কাজটি করতে হবে সংশ্লিষ্ট জাতিকেই। সেই জাতির আর্থ-সামাজিক গতি-প্রকৃতি বা ডায়নামিক্সের (যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সেই জাতির ওপর এসে পড়া আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অভিঘাত) ধারাতেই কেবল সে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারবে। মুক্তি সংগ্রামের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা-সংহতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মুক্তি কখনো বাইরের শক্তি দ্বারা চাপিয়ে দেয়া যায় না। মুক্তি কখনো আমদানি-রপ্তানি করা যায় না। ‘নির্ভরশীল মুক্তি’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় যদি অসম বিকাশের সূত্র কার্যকর না থাকতো তা হলে জাতি নির্বিশেষে সমগ্র মানব সমাজ হয়ে উঠতো একটি একশিলা অখণ্ড আর্থ-সামাজিক সত্তার অংশ। বুর্জোয়া পণ্ডিতরা পরস্পর নির্ভরশীল দুনিয়া, অখণ্ড বিশ্ব ব্যবস্থা, গ্লোবাল ভিলেজ ইত্যাদি কথা দিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতিকে যেভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে তাতে অসম বিকাশের তত্ত্বটিকে এবং জাতি ও শ্রেণির মধ্যে বিরাজমান অসমতার বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়া হয় না। পরস্পর নির্ভরশীলতা যে এখন একটি বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা যে একপাক্ষিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ (asymmetrical interdependence), সে কথাটিও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আমেরিকার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতার সাথে কি বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার নির্ভরশীলতা সামান্যতমভাবেও তুলনীয় হতে পারে? স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে এই তথাকথিত ‘পরস্পর নির্ভরশীলতা’ হলো প্রায় সম্পূর্ণভাবেই একপাক্ষিক। বস্তুতঃ, বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা ‘পরস্পর নির্ভরশীল বিশ্বের’ তত্ত্বকে এককেন্দ্রিক ও সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভরশীল বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচার করে থাকে।
দুনিয়াটা সত্যিই যদি একশিলা ও পারস্পরিক নির্ভরশীল একটি অখণ্ড সত্তা হতো তা হলে শোষণ-বৈষম্যের বিষয়টি হতো শুধুমাত্র সমাজের আভ্যন্তরীণ একটি বিষয়। সে ক্ষেত্রে জাতিগত বিভাজনের কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকতো না। সে অবস্থায় শোষণ-বৈষম্য থেকে সমগ্র মানব সমাজের মুক্তির সংগ্রামও হতো একটি অখণ্ড সংগ্রাম। সে ক্ষেত্রে, আমেরিকায় শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটাতে পারলে সারা বিশ্বে সয়ংক্রিয়ভাবে শোষণ-বৈষম্যের অবসান হয়ে যেতো। তাই, দেশে দেশে নিজ নিজ মতো করে মুক্তির সংগ্রামে শক্তি দেয়ার বদলে গোটা বিশ্ববাসীর দায়িত্ব সে ক্ষেত্রে হয়ে উঠতো একটাই,— শোষণ-বৈষম্যের বিশ্ব ব্যবস্থার হেডকোয়ার্টার আমেরিকায় মুক্তি সংগ্রামকে সফল করা। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি বাস্তবে সেরূপ নয়। মানব সমাজ একটি একশিলা অখণ্ড সত্তা নয়। অসম বিকাশের সূত্র কার্যকর হওয়ার কারণে বিশ্ব আজ অগ্রসর ও অনগ্রসর দেশ ও জাতিতে বিভাজিত। প্রতিটি জাতিরই আবার রয়েছে আপন আপন বিকাশের স্তর ও নানা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। ফলে শোষণ-বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের প্রয়াসটি সমাজের আভ্যন্তরীণ শ্রেণিসংগ্রাম (শোষক ও বৈষম্য সৃষ্টিকারী শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত ও বৈষম্যের শিকার হওয়া শ্রেণির সংগ্রাম) হওয়ার পাশাপাশি তা একই সাথে হয়ে ওঠে জাতিগত শোষণ-বৈষম্য অবসানের জন্য জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম।
জাতিতে জাতিতে বিভাজিত মানব সমাজ সভ্যতাকে বৈচিত্র্যমণ্ডিত করে তোলে। এই বৈচিত্র্য হলো সভ্যতার সম্পদ। জাতিগত বৈচিত্র্যের মাঝেই বিশ্ব মানবের ঐক্য ও মহামিলন প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু যুগ পরম্পরায় বিভিন্ন জাতির ক্ষেত্রে অসম বিকাশের সূত্র কার্যকর থাকায় সৃষ্টি হয়েছে শ্রেণি-শোষণের পাশাপাশি জাতিগত শোষণের ধারা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জাতিগত শোষণ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের রূপ নেয়ার পর তা গোটা বিশ্বকে পুঁজির শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। পুরানো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বদলে স্থান করে নিয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা। জাতিগত বৈচিত্র্যের যে অপার সম্ভার মানব সভ্যতার সম্পদ ও সৌন্দর্য, অসম বিকাশের সূত্র কার্যকর হওয়ায় তার মাঝে শোষণ-বৈষম্য স্থান করে নিয়েছে। এ হলো সভ্যতার বিকৃতি। সভ্যতাকে বিকৃতি মুক্ত করতে হলে জাতিগত শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটানো তাই অপরিহার্য। একই সাথে একথাও সত্য যে, যেহেতু অসম বিকাশের সূত্রের কার্যকরণ বন্ধ না করতে পারলে স্থায়ী ভাবে জাতিগত শোষণ-বৈষম্যের অবসান ঘটানো যাবে না, তাই এই সূত্র কার্যকর হওয়ার ফলে যে শ্রেণি-শোষণ ও শ্রেণি-বৈষম্যের জন্ম হয় তার অবসানের লক্ষ্যে একই সাথে কাজ না করতে পারলে জাতিগত শোষণ-বৈষম্যও দূর হবে না।
এ থেকে একথা বেশ স্পষ্ট যে, আমাদের মতো একাধারে জাতিগত শোষণ ও সেই সাথে শ্রেণিগত শোষণে জর্জরিত জনগণকে শোষণ-বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে জাতিগত ইস্যু ও শ্রেণিগত ইস্যু নিয়ে সংগ্রাম সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সংগ্রামের এই দুই ধারার মধ্যে স্তরভেদ করে আগানোর কোনো সুযোগ নেই। আগে জাতিগত শোষণের অবসান নিশ্চিত করে তারপরে শ্রেণিগত শোষণ থেকে মুক্তির ইস্যু হাতে নিতে হবে— এরকম চিন্তা করা হবে ভুল। আবার, দেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে শ্রেণি-শোষণ দূর করতে পারলে যেহেতু জাতিগত শোষণের ভিত্তি আর থাকবে না—এমন যুক্তিতে জাতিগত ইস্যু নিয়ে সংগ্রাম বন্ধ রেখে শুধু শ্রেণিগত ইস্যু নিয়ে পড়ে থাকাটাও হবে ভুল। জাতিগত ইস্যু ও শ্রেণিগত ইস্যু—এই দু’ধরনের ইস্যু নিয়েই একই সাথে সংগ্রাম করতে হবে। এই দুই সংগ্রামের মধ্যে একটি ডায়ালেকটিকাল ঐক্য রয়েছে। একটি অপরটির পরিপূরক।
আমাদের দেশের ইতিহাসও এই বিষয়টিকে সঠিক বলে প্রমাণিত করে। বৃটিশ আমলে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিল, জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ, মহাজনি ঋণের শোষণের বিরুদ্ধে খায়-খালাসি আইন প্রণয়ন ইত্যাদি দাবিতে তীব্র গণআন্দোলন চলেছে। পাকিস্তানের একেবারে গোড়ার সময়ে একদিকে ভাষার অধিকারের দাবিতে আন্দোলন ও অন্যদিকে কৃষকের শ্রেণি-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তেভাগা, টংক, নানকার ইত্যাদি আন্দোলন একই সাথে চলেছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির অধিকারের দাবির পাশাপাশি কৃষক-শ্রমিকের দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে স্থান করে নিয়েছে। গোটা পাকিস্তানি আমল জুড়ে একদিকে যেমন চলেছে গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম, সাথে সাথে অগ্রসর হয়েছে শ্রমিক-কৃষকের রুটি-রুজির সংগ্রাম। ষাটের দশকের শেষ দিকে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের ইস্যু সম্বলিত ৬-দফা দাবির সাথে গুরুত্বপূর্ণ অনেক শ্রেণিগত দাবি যুক্ত হয়ে রচিত হয়েছে ঐতিহাসিক ১১ দফা। সেই ১১ দফার ভিত্তিতেই সংগ্রাম এগিয়ে গেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ অভিমুখে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা সূচিত হয়েছে চার মূলনীতি তথা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের নীতি-লক্ষ্যকে ভিত্তি করে। আম-জনতার অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে, জাতিগত ইস্যু ও শ্রেণিগত ইস্যুকে পাশাপাশি নিয়ে ইতিহাস অগ্রসর হয়েছে।
শাসক শ্রেণি এই দুই ইস্যুকেই সমানভাবে রুখে দাঁড়ানোর কাজে নিয়োজিত থেকেছে। জাতিগত হোক বা শ্রেণিগত হোক, কোনো বিষয়েই তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে কখনই রাজি হয়নি। শাসক শ্রেণি আগাগোড়াই আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী ও তার দ্বারা লালিত হওয়ায় তারা জাতিগত শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রামকে প্রতিহত করেছে। আর, শ্রেণিগত শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সে দমন করেছে রাষ্ট্র ও সমাজে শোষণ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য।
দেশের বামপন্থি-প্রগতিশীল শক্তি জাতিগত ইস্যু ও শ্রেণি ইস্যু-উভয়কেই একসাথে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে তাদের মধ্যে কেউ-কেউ শ্রেণি ইস্যুতে সংগ্রাম অগ্রসর করাকে বামপন্থিদের একমাত্র কাজ বলে অনেক সময় গুরুতর ভুল পথ নিয়েছে। ষাটের দশকে নকশাল আন্দোলনের প্রভাবে এরূপ ভ্রান্তি বেশ বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে বামপন্থিদের বিপরীত প্রবণতার একটি অংশের মধ্যে আগে জাতিগত ইস্যু ফয়সালা করে তারপরে শ্রেণি ইস্যুতে সিরিয়াস সংগ্রাম করা উচিত, এরূপ ভ্রান্ত চিন্তা কাজ করেছে।
এদিকে, বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা তাদের সমস্ত কাজকর্ম শুধুমাত্র জাতিগত ইস্যুর মধ্যে আবদ্ধ রেখে চলেছে। শ্রেণি ইস্যুতে তারা আম-জনতার স্বার্থের বিরুদ্ধে থেকেছে অথবা লোক ভুলানো ভাঁওতা দিয়েছে। ফলে জাতিগত ইস্যুতেও তারা সব সময় একনিষ্ঠ ও দৃঢ় থাকতে পারে নাই। বামপন্থিদের যে অংশটি শ্রেণি আন্দোলনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সত্ত্বেও আগে জাতিগত ইস্যু ফয়সালা করতে হবে বলে ভাবতো নিজেদের অজান্তে হলেও তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের লেজুড়বৃত্তি করতে হয়েছে। আজ যখন দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বলয়ের বাইরে বামপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিকল্প বলয় গড়ার কাজটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তখন এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু তত্ত্বকথা নয়, এগুলো বাস্তব কাজের জন্য সঠিক পথ নির্ধারণে অপরিহার্য।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : selimcpb@yahoo.com