কর্মীদের সঙ্গে দূরত্বই ডুবিয়েছে লিটনকে
সমীর কুমার ও আনিসুজ্জামান, রাজশাহী থেকে
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৩, ২৩:১৩
বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে একাই চলেছেন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। উন্নয়নের জোয়ারে রাজশাহীকে ভাসিয়ে দিয়েও শেষ রক্ষা হলো না তার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কাছে প্রায় অর্ধলক্ষ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত প্রায় ৫ বছরে ক্ষমতার মোহে অন্ধ ছিলেন তিনি। তার দফতরে ঠাঁই মেলেনি দলীয় নেতাকর্মীদের। ঠিকাদারি কাজের ক্ষেত্রে কোন সুবিধা পাননি আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৪ জন ঠিকাদারকে দিয়ে সব কাজ করিয়েছেন। এদের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এসব অভিযোগ নিয়ে যারাই লিটনের কাছে গেছেন তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দল নয়, রাজশাহীর উন্নয়নই তার ভাবনা। এখানে কে কোন দলের লোক, কে কাজ পেল আর কে পেল না এটা বিবেচ্য নয়। আর এসব কারণে ওয়ার্ড পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীরা তার উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন। নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় নেতারা এসেও তাদের মাঠে নামাতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার নির্বাচনের ফল তাই হয়েছে।
অবশ্য বিশ্লেষকদের অন্য একটি পক্ষ অবশ্য বলছে, লিটন রাজশাহীর উন্নয়নে যা করেছেন তাতে পুনরায় তারই নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে সরকার বিরোধী প্রচারণা কাজে লেগেছে। বর্তমান সরকারের দুর্নীতি, অনিয়ম আর দুঃশাসনের শ্লোগান দেয়া হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পক্ষ থেকে। শেষ মুহূর্তে রাজশাহীতে গ্যাস দেয়া হলেও স্থানীয় মানুষ মনে করেন, নিছক লোক দেখানোর জন্যই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজশাহীতে এই সংযোগ দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনের প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়ক ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা ইত্তেফাককে বলেন, প্রধানত দু’টি কারণে তাদের এই ভরাডুবি হয়েছে। প্রথমত- জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়েছে এই নির্বাচনে। আর দ্বিতীয়ত- মৌলবাদী গোষ্ঠী বিশেষ করে জামায়াত-শিবির চক্র মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সঙ্গে ছিল কালো টাকার প্রভাব। তিনি বলেন, গত ৫ বছরে রাজশাহীতে যে উন্নয়ন হয়েছে এর আগে ২০ বছরেও তা হয়নি। তার মতে, এই নির্বাচনে জামায়াত অন্তত ২০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এসবের কারণেই প্রতাশিত ফল পাওয়া যায়নি বলে মনে করেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক ফল বিশ্লেষণ করলেন একটু অন্যভাবে। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজশাহী। আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির ভোটও এখানে বেশী। এবার বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে কোন বিভেদ ছিল না। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে বুলবুলের পক্ষে কাজ করেছেন। তার মতে, লিটন উন্নয়ন করেছেন ঠিকই। কিন্তু এসব কাজকর্মে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাখেননি। আমাদের দেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী কেউ ক্ষমতায় গেলে জনগণ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। লিটনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ফলে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী মন দিয়ে কাজ করেননি। ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেককেই নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। এসব নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের তেমন উদ্যোগও চোখে পড়েনি। এছাড়া ক্ষমতায় থাকার সময় লিটন এমন অনেক জায়গায় হস্তক্ষেপ করেছেন, যা তিনি না করলেই ভালো হতো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্ররা ভালোভাবে নেননি। এসব কারণ ছাড়াও তিনি মনে করেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শেষ পর্যন্ত আর স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছিল না। তাই সরকারের শেষ সময়ে সরকার বিরোধী প্রচারণা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন নব নির্বাচিত মেয়র বুলবুল।
বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নাদিম মোস্তফা বলেছেন, সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ রায় দিয়েছেন। তাছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীরা দলের প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন বলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেছে। প্রশাসনের উপর সরকারের হস্তক্ষেপের পরও জনরায় বদলানো যায়নি।
তবে আওয়ামী লীগ দলীয় রাজশাহীর সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম মনে করেন, এটা সরকারের বিরুদ্ধে কোন জনরায় নয়। নিজেদের কিছু ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। সংগঠিত প্রচারণা না চালানো, কর্মীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি অনেক ক্ষতি করেছে। তাছাড়া মৌলবাদী গোষ্ঠীও ধর্মভীরু মানুষদের বিভ্রান্ত করেছে।