পরিবর্তনের শ্লোগানে হেরে গেছে কামরানের ব্যক্তি ইমেজ
নিজামুল হক, সিলেট থেকে ফিরে
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৩, ২৩:১৪
টানা ১৮ বছর ধরে নেতৃত্বে থাকা বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ভিত নাড়িয়ে দিয়ে বিজয়ের মালা পরলেন আরিফুল হক চৌধুরী। ‘ব্যক্তি ইমেজে’ অনেকটা এগিয়ে যেতে পারেন কামরান, এমন ধারণা হলেও ‘সময়ের পরিবর্তন’ শ্লোগানের সাথে তা আর টিকল না। এ কারণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সমর্থিত প্রার্থীকে বিদায় নিতে হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের শীর্ষ পদ থেকে। আর নগর পিতার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। যেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এমন ধারণা ছিল, সেখানে বিশাল ব্যবধানে (৩৫ হাজারেরও বেশি ভোট) জয় পরাজয় হওয়ায় বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। নীরব ভোটের মাধ্যমে বিশাল ব্যবধানে কেউ জয়ী হবেন ভোট গণনার আগ পর্যন্ত কেউ আঁচ করতে পারেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মেয়র পদে এক ব্যক্তিকে দেখতে চায় না সিলেটবাসী। তারা পরিবর্তন চেয়েছে। তাই পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আর এ কারণে পরাজয় হয়েছে কামরানের।
আর আরিফুল হক চৌধুরীর প্রচার কৌশলটি ছিল ভিন্ন। সবার মাঝে তিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন যে, সিলেটে পরিবর্তন দরকার। তিনি নির্বাচনী প্রচারে ‘সময়ের সাথে চাই পরিবর্তন’ বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছিলেন। বিশেষ করে তরুণদের বেশিরভাগই ছিল পরিবর্তনের পক্ষে।
আরিফুল হক চৌধুরী ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কমিশনার নির্বাচিত হন। একইসঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই সময় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। সিলেট সদর আসনের সংসদ সদস্য হিসাবে এম সাইফুর রহমান সিলেট নগরীতে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেন তা দেখাশোনা ও তদারকির দায়িত্ব পান তিনি। তিনি ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, সিলেটে যে উন্নয়ন হয়েছে তাতে তার ব্যাপক অবদান রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিলেট নির্বাচনে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুও ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করছে। সারা দেশে সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টিও আমলে নিয়েছে সিলেট নগরবাসী। অনেকে বলছেন, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি, শেয়ার বাজারে ধস, হলমার্ক কেলেংকারি, সরকার দলীয় ক্যাডারদের সন্ত্রাস, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে সিলেটবাসী। সিলেটের মানুষ ধর্মভীরু। এ কারণে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের আচরণেও সিলেটের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
অন্যদিকে আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে সক্ষম হয়েছিলেন। তার পক্ষে স্থানীয় বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী ছাড়া জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত ইসলাম, হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামী সকল সংগঠন মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশ ও গণসংযোগে ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অন্যদিকে কামরান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়া ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকে কাজে লাগাতে পারেননি। কোন গণসংযোগে শরিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও দেখা যায়নি। এটা কামরানের পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ভোটাররা বলছেন, সিলেটবাসী খুবই সচেতন। সিলেট উন্নয়নে বিশাল অংকের টাকা ব্যয় হলেও দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে এখনও মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। রাস্তায় বের হতে পারেন না। এ বিষয়টি ততটা গুরুত্বের সাথে দেখেননি কামরান। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এ জলাবদ্ধতার বিষয়টি নগরবাসী কামরানের নজরে এনেছিল।
১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী ও নগর উন্নয়ন কমিটির সাবেক সভাপতি আরিফুল হক চৌধুরী ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চেয়েছেন। বলেছেন, নেতৃত্বে পরিবর্তন আনুন দেখুন কিভাবে সিলেটের উন্নয়ন হয়। তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ১৪ দফা পেশ করেন। নির্বাচিত হবার পর আরিফ বলেন, বর্তমান সরকারের জুলুম- অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ কারণে এ জয় জনগণের।