ইকবাল খন্দকার
জরুরি একটা কাজে আমার এক বড়ভাইকে ফোন দিলাম। বড়ভাই ফোন রিসিভ করেই এমন গলায় কথা বললেন, আমি বুঝে গেলাম তিনি খুব ঝামেলার মধ্যে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে?’ বড়ভাই চরম বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘আরে আর বলিস না, কী এক ঘোড়ার ডিমের গরম পড়েছে! এই গরমের ঠেলায় আমার বেইজ্জতি দশা। বাসায় হইচই, ছোড়াছুড়ি, ভাঙচুর। উফ, কী যে একটা অবস্থা!’
আমি বললাম, ‘গরমের কারণে অনেক সমস্যাই হয়। তাই বলে হইচই, ছোড়াছুড়ি, ভাঙচুর হয়, এমনটা কিন্তু কখনো শুনিনি। তা এমন হওয়ার কারণ কী?’
বড়ভাই বললেন, ‘কারণ তো বললামই। গরম। আমার বাসায় বেশ ক’টা লম্বা চুল পাওয়া গেছে। তোর ভাবি ধরেই নিয়েছে অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে আমার পরকীয়া চলছে। ব্যস, প্রথমে হইচই। তারপর ছোড়াছুড়ি। ভাঙচুর।’
আমি বললাম, ‘লম্বা চুল হলেই সেটা অন্য মহিলার হবে কেন? ভাবিরও তো হতে পারে। পারে না?’
ভাই বললেন, ‘বেহুদা কথা বলিস না। তোর ভাবির চুল কালার করা। প্রায় প্রতি সপ্তাহে সে পার্লারে যায় চুল কালার করতে। অতএব কোনটা তার চুল, কোনটা অন্য মহিলার চুল, খুব সহজেই আলাদা করা যায়।’
আমি বললাম, ‘মানলাম। কিন্তু আপনার বাসায় অন্য মহিলার চুল আসে কিভাবে? কোত্থেকে?’
বড়ভাই বললেন, ‘এই যে বললাম, গরম।’
আমি বললাম, ‘আজব ব্যাপার তো! গরমের সঙ্গে অন্য মহিলার চুল আসা না আসার সম্পর্ক কী?’
বড়ভাই বললেন, ‘আছেরে পাগলা, আছে। আমি যে রুমে ঘুমাই, এমনিতে সাধারণত এই রুমের জানালা বন্ধ থাকে। কিন্তু এখন এত বেশি গরম পড়েছে যে, এখন জানালা বন্ধ রাখতে পারি না। সারাদিনই খোলা থাকে।’
আমি বললাম, ‘আপনি তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই গরমের কথাই বলছেন। চুলের কথা বলেন শুনি।’
বড়ভাই বললেন, ‘আরে বাপুরে, চুল তো এই গরমের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। গরমের কারণে সারাদিন জানালা খোলা রাখতে হয়। আর ওপরতলায় যারা থাকে, তারা আবার ততটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ধার ধারে না। পেঁয়াজের খোসা, মরিচের বোঁটা, এমনকি মাথা আঁচড়ানোর পর যে চুল পড়ে, সব ঝাড়ু দিয়ে ঝেড়ে নিচে ফেলে দেয়। এদিকে গরমের কারণে যেহেতু আমার জানালা সবসময় খোলা থাকে, উপর থেকে যা যা ফেলে, সব ঢুকে পড়ে আমার ঘরে। পেঁয়াজের খোসা আর মরিচের বোঁটা নিয়ে তো কোনো সমস্যা নেই, সব সমস্যা চুল নিয়ে। উফ! কবে যে শীতকাল আসবে! কবে যে জানালা বন্ধ করতে পারব!’
আমার এক ছোটভাই মেসে থাকে। গতকাল দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম, মেসে তো এসি নেই, কিভাবে এই গরম পার করছে? ছোটভাই বলল, ‘একটু বুদ্ধি করে চলতে পারলে কোনো সমস্যাই আর সমস্যা না। আপনার এই ছোটভাই বুদ্ধি করে চলছে। তাই মেসে এসি না থাকা সত্ত্বেও এসির বাতাস পাচ্ছে। এই গরমে সে সাংঘাতিক আরামে আছে। আপনার চেয়েও বেশি আরামে আছে বলতে পারেন।’
আমি বললাম, ‘বিষয়টা কি একটু খুলে বলা যায়?’
ছোটভাই শুরু করল খুলে বলা, ‘আমার কাছে মেসওয়ালা মানে বাড়িওয়ালা পাঁচ মাসের ভাড়া পায়। দেব, দিচ্ছি করে দেওয়াও হয় না, বাড়িওয়ালারও টেনশন কমে না। এদিকে আমি তার সামনেই পড়ি না। আজকাল সে করে কী, আমাকে ধরার জন্য সারাদিন মেসে এসে বসে থাকে। সে নাকি ঘোষণা দিয়েছে আমার সঙ্গে দেখা না করে, আমার কাছ থেকে ভাড়া আদায় না করে বাসায় ফিরবে না। করছেও তাই। গভীর রাতের আগে বাড়ি ফিরছে না। আর আমিও এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছি। সে যতক্ষণ আমার মেসে বসে থাকে, ততক্ষণ আমি তার বাড়িতে বসে থাকি। ভাবটা এমন, যেন আমি ভাড়া দেওয়ার জন্য তাকে খুঁজছি। আসলে মূল উদ্দেশ্য হলো তার বাসার ড্রয়িংরুমের এসির বাতাস খাওয়া। গভীর রাতে যখন বুঝতে পারি সে ফিরবে, তখন আস্তে করে কেটে পড়ি।’
আমি বললাম, ‘তার মানে দিনে এসির বাতাস পেলেও রাতে তো পাচ্ছিস না।’ ছোটভাই বলল, ‘এটা ঠিক বলেছেন। দেখা যাক, রাতে যাতে এসির বাতাস পাই, এই জন্য একটা ধান্দা বের করতে হবে। দোয়া রাখবেন।’