তারেকুর রহমান
মাঝে মাঝে ঢাকায় আসেন হেকমত। কারণে অকারণে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। এবার এক মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি ঢাকায় এসেছেন। ঢাকায় নিয়মিত না থাকলেও ঢাকার অলিগলি তার খুব চেনা। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হেকমত। এদিকে হঠাত্ তার পেট মোচড় দিয়ে উঠল। ঘটনা কী! এই অসময়ে এরকম সিগনাল দেওয়ার তো কথা ছিল না। হেকমত এটাকে রং সিগনাল মনে করে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যাওয়ার পর অবস্থা বেগতিক হলো! হেকমত আশপাশে ঝোপঝাড় খুঁজতে লাগল। গ্রামে এরকম বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সে ঝোপঝাড়েই কর্ম সম্পন্ন করে। ঢাকা শহরে এরকম জায়গা পাওয়া বেশ মুশকিল। নানা মানুষকে জিজ্ঞেস করে একটা পাবলিক টয়লেটের খোঁজ পেল। অমুক তমুক গলির শেষ মাথায় টয়লেট। একেকজন একেক ঠিকানা দিচ্ছে। অবশেষে ঢাকার অলিগলি মাড়িয়ে পাবলিক টয়লেটের সামনে উপস্থিত হলো হেকমত। এদিকে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম। টয়লেটের সামনে বিশাল লাইন দেখে তার চোখে পানি চলে এল। আর কতক্ষণ চেপে রাখা যায়! কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে যায় সে টেনশনে হেকমতের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে লাগল। হেকমত লাইনের একদম শেষে। তার পরে এখনো কেউ আসেনি। হয়তো একটু পর আসবে। আধা ঘণ্টা পর হেকমত টয়লেটে ঢুকার সুযোগ পেল। কয়েকদিন আগে সে পত্রিকায় পড়েছে, ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো নাকি ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। লাইফে সে কোনো দিন ফাইভ স্টার হোটেলে ঢুকেনি। এক উছিলায় আজ সে ফাইভ স্টার হোটেলে ঢুকবে। এ চিন্তা করে তার কষ্ট কিছুটা কমে যায়। ঢুকতেই দেখল উত্কট গন্ধে টয়লেটের ভেতর খুব বাজে অবস্থা বিরাজ করছে। তবু দ্রুত একটা টয়লেটে ঢুকে পড়ল সে। বসতেই চোখে পড়ল ভেতরে পানির কল ভাঙা। তাড়াতাড়ি করে পরের টয়লেটে ঢুকল সে। না, এই টয়লেটে পানির ট্যাপ আছে। পানি বের হচ্ছে। কিন্তু এমন অবস্থা যে কয়েক বালতি পানি মারলেও সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে না। হেকমত ভেতরে ঢুকে দরজা আটকাতে গিয়ে দেখে ছিটকিনি নেই। এই মহা বিপর্যয়ে হেকমত নিজের ধৈর্য ধরে রাখল। নিজের কোমরের বেল্ট খুলে দরজার হ্যান্ডেলের সঙ্গে প্যাঁচিয়ে নিজের হাতে একাংশ রেখেছে। যা হোক, এবার একটু শান্তিমতো কাজটা শেষ করা গেলেই হয়। হেকমত ভেতরে ঢুকার পর পরই দরজা থাপড়াতে শুরু করল লোকজন। তাড়াতাড়ি সে বের হচ্ছে না কেন—এজন্য চিত্কার করে গালিগালাজ করছে তারা। হেকমত ভয়ে আছে কখন আবার দরজা টেনে খুলে ফেলে। তার হাতে বেল্টের এক প্রান্ত থাকলেও ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। লোকজন একবার দরজা খুলে ফেললে মানইজ্জত সব ধুলায় মিশে যাবে। হেকমতের বের হতে দেরি দেখে এক লোক দরজার একটা ছোট ছিদ্র দিয়ে হেকমতকে বলল, ‘এই বেটা, বের হবি নাকি দরজা ভেঙে ফেলব।’ হেকমত লজ্জা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। সে খেয়ালই করেনি এরকম একটা ছিদ্র আছে দরজায়। সে ভেতর থেকে বলল, ‘এই তো বের হচ্ছি।’ বদনা ভরার আগেই পানি শেষ হয়ে গেল। হেকমত কোনোরকমে অল্প পানি দিয়েই কাজ শেষ করে বেরিয়ে এল। বের হওয়ার পর সে পড়ল লোকজনের হাসিঠাট্টার মাঝে। একজন বলল, ‘এই লোক মনে হয় গত এক সপ্তাহ টয়লেটে যায় নাই। তাই একটু দেরি করছে।’ হেকমত কোনোমতে তার মানইজ্জত নিয়ে পাবলিক টয়লেট থেকে বেরিয়ে এল। এ কেমন ফাইভ স্টার হোটেল—তার বুঝে আসছে না। ঢাকার টয়লেটকে ফাইভ স্টার হোটেল বলার কোনো কারণই খুঁজে পেল না হেকমত। তবে সে প্রতিজ্ঞা করছে, আর কখনো এরকম ফাইভ স্টার হোটেলের ন্যায় পাবলিক টয়লেটে ঢুকবে না।