স্মরণ
ড. নীলিমা ইব্রাহিম :তাঁর জীবন ও কর্ম
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৩, ২১:৫৬
গত ২০০২ সালের ১৮ই জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তুমি এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছো। কাকতালীয়ভাবে আজও সেই মঙ্গলবার। মঙ্গলের, কল্যাণের, মানবিকতার, অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধ চেতনার, পাশাপাশি, মুক্ত ও শুভ বুদ্ধির প্রদীপ ছিলে তুমি। তথাপি অত্যন্ত দ্রুত বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে আমরা ঠেলে দিচ্ছি তোমাকে। অন্তত আজকের এই একটি দিন আমরা তোমাকে স্মরণ করবার চেষ্টা করছি। এর চেয়ে বেশি তোমার জন্য আমরা আর কি করতে পারি? তোমাকে নিয়ে কি লিখবো? যাই লিখি তাই-ই অবান্তর মনে হয়। কারো কর্ণকূহরে তোমায় নিয়ে আমাদের কথা পৌঁছায় না। ইতোমধ্যে বিস্তীর্ণ সময় পার হয়ে গেছে- অনেকের স্মৃতির পাতাও বিবর্ণ। তবু মানুষ ও সমাজের প্রতি এবং সবচেয়ে বড় কথা দেশ ও জাতির জন্যে তোমার অন্তহীন ভাবনা, প্রেম ও দায়বদ্ধতার কথা আমরা কখনো ভুলতে পারি না।
এদেশে স্বাধীনতা এসেছে রক্তপূর্ণ ঘটে, অভিষেক হয়েছে বঙ্গজননীর। এত সহজে এটা ঘটেনি। উনসত্তরের গণআন্দোলনে, অসহযোগে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সবার পুরোভাগে ছিলে তুমি। বুদ্ধিজীবীদের নানান সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছো। ষাটের দশকে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল ছাত্র নেতা-কর্মীর তুমিই ছিলে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। জননীর মত স্নেহ-মমতায় আপন সন্তানের মতই তাদেরকে আগলে রেখেছিলে। সেসব ছাত্রনেতার অনেকেই রাজনীতিতে এখনও দেদীপ্যমান- তারা কি তোমায় একটি দিনের জন্যও স্মরণ করে? না, তা করে না।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়ঙ্কর বিপদের মুখেও তুমি দেশান্তরী কিংবা শরণার্থী না হয়ে তোমার ভাষায় ‘শরণার্থী’ হয়েছিলে। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছো, তাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করেছো, এ কাজ জেনারেল টিক্কা খানের কাছেও গোপন থাকেনি। এ কোন্ সাহস বুকে ধারণ করেছিলে তুমি! যুদ্ধোত্তর পর্বের একেবারে শুরুতে পাগলের মতো সতীর্থ অধ্যাপকদের লাশ খুঁজে বেড়িয়েছো রায়েরবাজারে, মিরপুরের শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমিতে। অতঃপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ব্যবস্থা তুমিই করেছিলে। পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দালাল রাজাকার-আল শামস-আলবদর-শান্তি কমিটির নরপশুদের দ্বারা ধর্ষিত অসংখ্য বাঙালি নারী ও ওয়ার-বেবীদের পুনর্বাসনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি দায়িত্ব তুমি সফলভাবে সম্পন্ন করেছো। এ সব হতভাগ্য নারীদের নিয়ে রচিত তোমার কালজয়ী কথানাট্য ‘আমি বীরাঙ্গনা বল?ছি’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি চিরায়ত মানবিক দলিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যে সব বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পী বেতার ও টেলিভিশনে পাকিস্তানের দালালি ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এসব সাংস্কৃতিক রাজাকারদের খুঁজে বের করার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তোমার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আহ্?সানুল হক ও দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক এ,বি,এম মূসাকে নিয়ে যে রিপোর্ট প্রণীত হয়েছিল সেটি আর একটি প্রামাণিক ঐতিহাসিক দলিল।
এ দেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি তথা গোটা সমাজ ব্যবস্থা এখন অসুস্থ বিকারে আক্রান্ত। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, দুর্নীতি-দুরাচারের ভারে জনজীবন একেবারেই বিপর্যস্ত। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। এই বৈরী সময়ে তোমার মত অকুতোভয় সাহসী মানুষকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করা প্রয়োজন ছিল, তোমার মত মানুষের সারাজীবনের কর্ম ও কীর্তিকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল, আমরা তা করিনি, করতে পারিনি। আমাদের মত শিক্ষিত স্বার্থান্ধ সমাজের বাইরেও সাধারণ মানুষের একটি জগত্ আছে, তারা কিন্তু তোমাকে ভুলেনি। অতি সম্প্রতি খুলনা ফুলতলার মিলিটারী কলেজিয়েট স্কুলে একটি হোস্টেলের নাম করা হয়েছে তোমার নামে। হোক না তা অতি সামান্য একটি স্কুল। তুমি তো খুলনার-ই মেয়ে। অন্তর নিংড়ানো ভালবাসা দিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ এ কাজটি করেছেন এজন্যে তোমার বিদেহী আত্মার আশীর্বাদ তাদের প্রাপ্য। আমরা তোমার জন্য কিছু করতে পারলাম না—এ আমাদের দূরপনেয় লজ্জা ও দীনতা—এ দীনতা ক্ষমা করো হে জননী।
লেখক : কনিষ্ঠ জামাতা