আদর্শবাদের ধসের হাত থেকে বাঁচাতে যা প্রয়োজন

গত কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে প্রধানত দুইটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে। এই দুইটি দলের কাছাকাছি অন্য কোন দল বা জোট যেতে পারেনি। তাই ঘুরেফিরে গত দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল। এই দুইটি দলের সরকার গঠন মানেই এই দুই দলের দুই শীর্ষ নেত্রীর ক্ষমতা দখল। দুই নেত্রীর একক নির্দেশেই চলেছে দেশ এতদিন ধরে। মাঝখানে মাত্র দুই বছরের জন্য সেনা সমর্থিত বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ছিল দেশ। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান থাকলেও রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যবহারে এই দুই দলের তেমন কোন পার্থক্য চোখে পড়ে না। গণতন্ত্র এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই দুইটি দলই কাজে ও কথায় একেবারেই এক। এই দল দুইটিই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রে গড়ে ৬ শতাংশ ধরে রাখতে পেরেছে; দেশজ আয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির কিছুটা উন্নতি করতে পেরেছে, অনাবাসী আয়ের প্রবাহ ধরে রাখতে পেরেছে। কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। বিএনপি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে সাফল্য দেখিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার তা ধরে রাখতে পারেনি। বিএনপি সরকার বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছিল বিধায় আওয়ামী লীগ সরকার চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিদ্যুত্ খাতের উন্নতি করতে গিয়ে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ ক্রয় করার কারণে ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। পদ্মা সেতুতে নিজস্ব অর্থ প্রয়োগ করার ফলে আওয়ামী লীগের শেষ বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে কিছুটা হলেও বঞ্চিত করা হয়েছে। এই ছোট ছোট পার্থক্য ছাড়া বড় দুইটি দলের রাষ্ট্রনীতি বা সরকার নীতিতে বড় রকম কোন পার্থক্য ধরা পড়েনি গত দুই দশক ধরে। এক দল ক্ষমতায় থেকেছে, আর সেই দলের অনুসারীদের মধ্যে অবৈধ এবং বৈধ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থ প্রাপ্তির ধরনটি একই থেকেছে, শুধু অর্থের মালিকানার হাত বদল হয়েছে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, দুর্নীতির প্রসার, কালো টাকার দৌরাত্ম্য, সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দলীয়করণ সবই অবিকল থেকেছে, শুধু প্রযোগকারী বা লাভকারীর পরিচয় বদল হয়েছে। জামায়াত এবং জাতীয় পার্টির রাজনীতি এদেশের মানুষ লক্ষ্য করেছে। জামায়াত একেবারেই আলাদা ধরনের একটি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, প্রচলিত বিচার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সংবিধান প্রদত্ত ব্যবস্থা জামায়াতের পছন্দ নয়। জামায়াত নিজস্ব পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করার কথা ভাবে। তাদের পক্ষে তাই জাতীয় ভিত্তিতে বৃহত্ রাজনৈতিক দল হিসাবে বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশের সুযোগ কম। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির সাথে বিএনপির মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যা বিশ্বাস করে জাতীয় পার্টিও সেভাবেই বিশ্বাস করে। তাই বিএনপির পাশে জাতীয় পার্টির বৃহত্ ভূমিকায় আত্মপ্রকাশের সুযোগ কম। তার উপর জাতীয় পার্টির সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের বর্তমান বয়স। বামপন্থি কিছু দলের অস্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকলেও সবগুলো বাম দল এক হয়ে জোট গঠন করলেও তা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতির পরিচালক শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া তাদের জন্য সম্ভব নয়। অন্যান্য ছোট ছোট দল নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধা ছাড়া বড় কোন রাজনৈতিক অস্তিত্বের মধ্যে অবস্থান করছে না। এমন এক ধরনের শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক বন্ধ অবস্থার মধ্যে এদেশের মানুষের হাতে আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি ব্যতীত তৃতীয় কোন রাস্তা খোলা নেই। কিন্তু এই দল দুইটির অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এদেশের জনগণ খুব একটা খুশি নয়। কিন্তু তারপরও তাদের হাতে কোন বিকল্প না থাকায় তারা অসহায়ের মতো হয় আওয়ামী লীগ, না হয় বিএনপির উপর নির্ভর করেছে। একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির জন্য বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ উর্বর হয়ে আছে। সুযোগ আছে, সম্ভাবনা আছে; কিন্তু উপযুক্ত রাজনৈতিক দল বা জোট এগিয়ে আসছে না। যেখানে মাত্র দুইটি দল রাজনীতিকে কন্ট্রোল করে, সেখানে নতুন কারও প্রবেশ বা কর্তৃত্ব করার কাজটি সহজ নয়। কেননা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ এই বড় দুইটি দল। তাদের জন্য জনগণ কোন চ্যালেঞ্জ নয়। তবে সেই জনগণের কাছে পৌঁছে যাবার আগেই যে তাদেরকে কুপোকাত হয়ে যেতে হবে এই বড় দুইটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির কাছে। এই দুইটি দলেরই আছে হাজার হাজার কর্মীবাহিনী, যারা যে কোন নতুন শক্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবার জন্য যথেষ্টভাবে শক্তিমান। তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি একটি দল হতে পারে, আবার একটি জোটও হতে পারে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের প্রতি যারা মুখ ফেরাতে চান তারা মনে করেন, এই দুইটি দলই স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনা করে, এই দুইটি দলই দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ দিয়ে পরিচালিত, এই দুইটি দলেই আদর্শ ও গণতন্ত্র নেই এবং এই দুইটি দলের কর্মীবাহিনীতেই সন্ত্রাসী কর্মী বিদ্যমান। আদর্শবাদের প্রশ্নে আপোষহীন নতুন একটি জোট বা দল এই দুইটি দলের বিকল্প হতে পারে। বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিকভাবে একটি মহাসংকটের সময় পার করছে; আর এই শঙ্কাটি তৈরি করেছে এই বড় দল দুইটির পরস্পরবিরোধী অসহিষ্ণু কালচার। এক্ষেত্রে একটি শুভ পরিবর্তনের প্রয়োজন। তবে পরিবর্তন মানে এই নয় যে, একদল অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনীতিবিদের স্থানে আরেক দল অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনীতিবিদ এনে বসিয়ে দিতে হবে। পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সেই পরিবর্তনের আকার ও ব্যাপ্তি ছোট হতে পারে; কিন্তু সেখানে আদর্শের জায়গায় কোন কিন্তু থাকবে না। গ্রহণযোগ্য অনেকগুলো লোককে এক পতাকাতলে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। হয়তো তারপরই মানুষ এগিয়ে নিবে এই তৃতীয় শক্তিকে ধীরে ধীরে। যারা ইতিমধ্যে এই পরিবর্তন ঘটানোর কাজের মধ্যে আছেন তারা আরও একটু জোটবদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে গেলেই হবে। এগিয়ে যেতেই হবে। বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষকে, বাংলাদেশের রাজনীতিকে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সকলকেই আদর্শবাদের ধসের হাত থেকে বাঁচাতে একটি জনকল্যাণমুখী, গণতন্ত্রমুখী এবং আদর্শবাদী তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির জাগরণ ঘটাতেই হবে। লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা