প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটে সংকট
ক্রিকেটারদের প্রিমিয়ার লিগ বর্জন!
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৩, ২২:৩০
কয়েক মাস ধরে ঢাকা মহানগরী প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ নিয়ে যে জটিলতা চলছে, তাই গতকাল নাটকীয় মোড় নিল। দিনভর খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে নানা পর্যায়ের বৈঠকের পর গতকাল বিকালে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ (কোয়াব) আনুষ্ঠানিক-ভাবে জানিয়ে দিল—প্রস্তাবিত গ্রেডিং পদ্ধতি ও পারিশ্রমিকের অধীনে তারা প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেবেন না।
খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে লিগ বর্জনের এই বিবৃতি পড়ে শোনান রাজিন সালেহ। তাদের এই বিবৃতিতে প্রিমিয়ার লিগ ছাপিয়ে বিপিএলের দেনাপাওনার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রিমিয়ার ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের নিয়ম ও ঐতিহ্য ভঙ্গ করে একতরফা সিদ্ধান্তে প্রিমিয়ার ডিভিশনের দলবদল বাদ দিয়ে গ্রেডিং ও রোটেশন পদ্ধতি চালু হয়েছে বলে খেলোয়াড়রা গণমাধ্যমে জানতে পেরেছেন।
প্রিমিয়ার ক্রিকেটের দলবদলসহ পূর্বের সব নিয়মে বহাল না করা পর্যন্ত এবং বিপিএলের পাওনা পরিশোধের তারিখ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের সব ক্রিকেটার প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার ঘোষণা দিচ্ছেন বলেও বলা হল এই বিবৃতিতে।
মার্চ মাসে প্রিমিয়ার লিগ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি; বরং সে সময় থেকে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। গত কয়েক দিন টানাপোড়েন চরমে উঠেছি। কাল সকাল থেকে বোঝা যাচ্ছিল, নতুন কিছু হতে চলেছে। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জড়ো হন প্রায় আশিজন খেলোয়াড়। এরা আলোচনা করার পর জাতীয় দলের ক্যাম্প শেষে আলোচনায় বসেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মুর্তজা, নাসির হোসেন, শফিউল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম অমি, জিয়াউর রহমান জিয়া, রুবেল হোসেনসহ আরো অনেকে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সম্মতি দেয়ায় বিকেলে কোয়াব বর্জনের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
গত মার্চে চলতি মৌসুমের প্রিমিয়ার ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পাবে না বলে কয়েকটি ক্লাব তখন খেলতে আপত্তি জানায়। এরপর অনেক দেনদরবার করে অবশেষে বোর্ডের হস্তক্ষেপে ৩ জুলাই প্রিমিয়ার লিগ শুরুর দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। সেখানে ঠিক হয়, আগের মতো করে দলবদল আর করা হবে না। এবার বরং নিলামের মতো করে গ্রেড অনুযায়ী খেলোয়াড়দের বিভিন্ন ক্লাবে লটারির মাধ্যমে দিয়ে দেয়া হবে! কিন্তু বাদ সাধে খেলোয়াড়দের এই গ্রেডিং ও পারিশ্রমিক। বেশ কিছু সমস্যা দেখিয়ে ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয়।
পুরো ঘটনার জন্য সিসিডিএমকেই দায়ি করেছে কোয়াব। অথচ একদিন আগ পর্যন্ত কোয়াবের সাথে ক্লাবগুলোর দ্বন্দ্ব চলছিল প্রকাশ্যে। কাল কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল সেটাকে পাশ কাটিয়ে বলেন, ‘আমাদের ক্লাবের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমরা মনে করি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে তাদের অনেক ভূমিকা আছে। সব দায় ক্রিকেট বোর্ডের। বিসিবি এই টুর্নামেন্টের আয়োজক। কিভাবে টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে এটা তারাই সিদ্ধান্ত নিবে। গভর্নিং বডি হিসেবে কোনটা রিসিভ করবে কোনটা করবে না এটা তাদের ব্যাপার।’
কোয়াবের লিগ বর্জন এবং বোর্ডকে দোষারোপই বলছে, খেলোয়াড়দের আন্দোলন কার্যত বোর্ডের বিরুদ্ধে। চুক্তিবদ্ধ হিসেবে খেলোয়াড়রা বোর্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক, ‘আমি মনে করি খেলোয়াড়দের চুক্তি শুধু প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের বেলায়। প্রিমিয়ার লিগে নয়।’
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, এই পুরো আন্দোলনটি যারা করছে, গত কয়েক মাসের প্রক্রিয়ায় সেই কোয়াবের সঙ্গে বিসিবি, সিসিডিএম বা ক্লাব আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনাই করেনি। কোয়াব সবকিছুই নাকি সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে জেনেছে!
কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক আবারো এর জন্য দায়ি করেছে বোর্ডকে, ‘বোর্ড কখনোই আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেডিং কিংবা খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের বিষয়টি জানায়নি। আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বহুবার বৈঠক করেছি সিসিডিএম চেয়ারম্যানের সাথে। এমনকি আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের অবস্থানের কথা জানিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছি।’
আজই সমাধান করতে চায় বিসিবি
স্পোর্টস রিপোর্টার
শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নিচে দাঁড়িয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের (কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল। বললেন, তাদের দাবি-দাওয়া সংবলিত একটি চিঠি বিসিবির কাছে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু মাত্র একতলা ওপরে বিসিবি অফিসে গতকাল রাত পর্যন্তও নাকি সে চিঠি পৌঁছায়নি! চিঠি পৌঁছাতে যতো সময়ই লাগুক, অন্তত এরকম কোনো চিঠি পাননি বলেই দাবি করলেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামুদ্দিন চৌধুরী সুজন।
অবশ্য চিঠি আসুক কিংবা না আসুক আজ সমঝোতার জন্য কোয়াবের সাথে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে বিসিবি। কাল সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধান নির্বাহী। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা চাই খেলা হোক। সমঝোতার চেষ্টা করা হচ্ছে। হয়তো কাল (আজ) প্রথমেই আলোচনা সেরে ফেলতে পারি।’ যদিও কাল রাত পর্যন্ত এ ব্যাপারে ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্টোপলিশ (সিসিডিএম) কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি। সিদ্ধান্ত না নিলে কি হবে? প্রিমিয়ার লিগ হবে তো? সময়মত মাঠে গড়াবে কিনা? এসব প্রশ্ন তেড়ে আসছিল বিসিবির সিইও’র দিকে। সিইও অবশ্য বিষয়টিকে জটিল বলেই মন্তব্য করেছেন, ‘লিগ নিয়ে আসলেই কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হল।’
প্রশ্ন উঠেছে লিগ নিয়ে যখন এত অনিশ্চয়তা তখন বিসিবির ভূমিকা ছিল? কেনই বা ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কমিয়ে নিজেদের আর্থিক সুবিধার অংকটা বাড়িয়ে নিল? সিইও অবশ্য ক্লাবদের পক্ষ নিয়ে বলেন, ‘দেখুন ক্লাবদের ভূমিকা খাটো করে দেখার কিছু নেই। তাদের দিক বিবেচনা করে এটা করা হয়েছে। প্রক্রিয়াটা অনেকদিন ধরেই আছে। হয়তো টাকার অংকের ক্ষেত্রে একটু তারতম্য হচ্ছে।’
প্রশ্ন হচ্ছে আগে ক্লাবগুলোকে দেয়া হত ৩৫ লাখ টাকা কিন্তু এখন তারা পাবে ৫০ লাখ টাকা। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক কমিয়ে ক্লাবদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে বিসিবি কেন তাদের আর্থিক অনুদান বাড়িয়ে দিল? সিইও এবার বল ঠেলে দিলেন বিসিবির কোর্টে, ‘কেন বোর্ড অনুদান দেয় এটা বোর্ডই ভালো জানে।’
দাবি না মানলে খেলোয়াড়রা লিগ খেলবে না। আবার খেলোয়াড়দের দাবি মানবে না ক্লাবগুলো। বোর্ড এই অবস্থায় কি ভূমিকা নেবে? সিইও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘সবার জন্যই গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে এগুনো যাবে না। দুই পক্ষেরই তো একটা বিষয় আছে। আমরা আবারো বলছি, খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তাদের দাবিগুলো পাই তারপর সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।’