ভুয়া সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে ১৫০ কোটি টাকা লোপাট

ভুয়া বা জাল সঞ্চয়পত্র জমা দিয়ে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেডসহ (এবি ব্যাংক) কয়েকটি ব্যাংক থেকে দেড়শ’ কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়ে এবি ব্যাংকসহ ১৬টি ব্যাংকের ২২টি শাখায় ২০০ কোটি টাকার ভুয়া সঞ্চয়পত্র জমা রেখে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছে একটি চক্র। এর মধ্যে এবি ব্যাংক থেকেই প্রায় ১০০ কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে ১৬টি ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত রয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে দুদকের তদন্ত দল। তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শিগগীরই আদালতে চার্জশিট দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে তদন্ত টিম। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগ সূত্র জানায়, ২০০ কোটি টাকার এই সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে ঋণ নেয়ার ঘটনায় আরও মামলার অভিযোগপত্র দ্রুত জমা দেয়া হবে। ইতিমধ্যে ওই সব মামলায় এবি ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ প্রায় দুই ডজন লোককে আসামি করা হয়েছে। ভুয়া সঞ্চয়পত্রে এ জালিয়াতির ব্যাপারে দুদক কমিশনার মো. বদিউজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই সঞ্চয়পত্রে এ জালিয়াতি হয়েছে। দুদক টিম সে প্রমাণ পেয়েছে। দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চক্রটি এক ব্যাংক থেকে জাল সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে চেক গ্রহণ করে পরে তা অন্য ব্যাংকে জমা দিয়ে নগদ টাকা তুলে নিয়েছে। এই জালিয়াতিতে ওই সব ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশ ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জালিয়াত চক্র ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার জাল সঞ্চয়পত্র নিজেদের নামে জমা দিয়েছে। এসব অপকর্মে এসএম মাকসুদ মজুমদার, আতিকুর রহমান, তৌহিদ মাহমুদ, নজরুল ইসলাম, আব্দুল খালেক, আব্দুল কাইয়ুম মোল্লা ওরফে আবুল হোসেন খান, জাহিদ সেলিম ওরফে মো: জামাল উদ্দিন হাওলাদার. মো: দুলাল সিকদার ওরফে দুলাল হাওলাদার ওরফে কামাল সিকদার, জয়নাল খা ওরফে জাকির শেখ, মো: শাহ আলম খান ওরফে শিপন ওরফে আরিফ খান, তানভীর মাসুফু ওরফে মেহেমুদুর রহমান ওরফে মুরাদ, এইচ এম এ বারকি ওরফ বাদল ওরফে মোস্তাক, আমিনুল ইসলাম ওরফে মুকুল, আংগুর, আসাদুজ্জামান মিঠু, মো: নুরুজ্জামান ফকির ওরফে সাকিল কনট্রাক্টর এবং মুরশিদা আরফিন ওরফে আফরিন হাওলাদারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। দুদক সূত্র জানায়, ৫০ হাজার টাকা মূল্যমানের এসব সঞ্চয়পত্র ঢাকার জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও), খুলনার প্রধান ডাকঘর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ অন্যান্য ডাকঘর থেকে দেখানো হয়েছে। জালিয়াতচক্র সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে সরকারিভাবে ছাপা সঞ্চয়পত্রের মতো করে ওই ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ছেপেছে। জাল সঞ্চয়পত্রগুলো সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে নিয়েও কোন স্থান ও কোন প্রেস থেকে ছাপা হয়েছে, তা বের করা যায়নি। দুদক সূত্র আরো জানায়, গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সঞ্চয়পত্র জালিয়াতির এ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক খায়রুল হুদার নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম এ বিষয়ে তদন্ত করছেন। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন, মোনায়েম হোসেন ও মির্জা জাহিদুল আলম জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। জালিয়াতচক্রের সদস্যরা প্রথমে এবি ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় ২০ কোটি টাকার জাল সঞ্চয়পত্র জমা দিয়ে এর বিপরীতে ঋণের নামে আট কোটি টাকা উত্তোলন করে। এই আট কোটি টাকা জালিয়াতির ক্ষেত্রে ধানমন্ডি শাখার সাবেক এক ম্যানেজারের যোগসাজশ ছিল। ওই ম্যানেজার অবসরে যাওয়ার পর পরবর্তী ম্যানেজার ওই আট কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ নিলে জালিয়াতি ধরা পড়ে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হলে তারা তদন্ত করে ১৬টি ব্যাংকের ২২টি শাখায় ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র জমা রেখে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে পাঠালে কমিশন তা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সঞ্চয়পত্র জালিয়াতির এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়।