উত্তরাধিকার সূত্রে মামলার আসামি হয়েছি
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৩, ২৩:০৮
গতকাল সোমবার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় নিজেই নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি। এসময় তিনি বলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। আমার বাবার নাম ফজলুল কাদের চৌধুরী। তার সূত্রেই আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। আজ চাচার (বঙ্গবন্ধু) বই নিয়ে এসেছি। আমার বাবার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক ছিলো -তা আমাকে এই ট্রাইব্যুনালে বলতেই হবে।’
বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের উপস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেয়া সাক্ষ্যের শুরুতেই সালাউদ্দিন কাদের তার বংশীয় পরিচয় তুলে ধরেন। এছাড়া দ্বিজাতি তত্ত্বের কারণে উপমহাদেশে সামপ্রদায়িক সংঘাতের জন্ম হয়েছিলো- আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রপক্ষের এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন ।
এর আগে দুটি আবেদনের শুনানিকালে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। আমি কোথায় ছিলাম তা প্রমাণের জন্য বিদেশ থেকে সাক্ষী আনা প্রয়োজন। তারা যেন ভিসা পান এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা প্রয়োজন।’ পরে সালাউদ্দিন কাদেরকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় নেয়া হয়। এ সময় তিনি মনিটর সামনে নিয়ে ইংরেজিতে জবানবন্দি দেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম এতে আপত্তি জানালেও ট্রাইব্যুনাল মনিটর রাখার অনুমতি দেয়।
সালাউদ্দিন কাদের বলেন, ‘আমি ৩৩ বছর ধরে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছি। এখানে শপথ না নিলেও আমার কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘জবানবন্দি দেয়ার সময় কিছু ডকুমেন্ট প্রদর্শন করবো।’ তখন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা বলেন, আগে জমা দেয়া ডকুমেন্টের বাইরে কোনো ডকুমেন্ট প্রদর্শন করতে হলে আবেদন করতে হবে। তখন তিনি বলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি প্রদর্শন করতে চাই। এটা করলে কি কবীরা গুনাহ্ হবে?’
সাফাই সাক্ষ্যের শুরুতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার জন্ম ১৩ মার্চ ১৯৪৯। এরপর তিনি তার বিস্তারিত বংশ পরিচয় উত্থাপন করেন। একে একে বাবা, মা, ভাই, বোন, সন্তান ও আত্মীয়দের পরিচয় তুলে ধরেন। এক পর্যায়ে বলেন, আমার কাজিনদের মধ্যে রয়েছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি মাঈনুর রেজা চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ফজলে করিম চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা সালমান এফ রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সূত্রেই আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। তাই তার ব্যাপারে বিস্তারিত বলতেই হবে। তিনি ১৯১৯ সালের ২৬ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালে তিনি দুই বার কারমাইকেল হোস্টেলের ভিপি নির্বাচিত হন।’ এসময় তিনি বলেন, ‘এখানে একজন প্রফেসর সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন যিনি ৪০ বছর ধরে নিজের জন্মস্থান নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।’
বংশীয় পরিচয় শেষে সালাউদ্দিন বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের কারণে উপ-মহাদেশে সামপ্রদায়িক সংঘাত হয়েছে। এ বক্তব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য অবমাননাকর।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটির কথা উল্লেখ করেন। এক পর্যায়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসা করে বলেন, ‘দেশে ফেরার তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মিত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশ ত্যাগ করিয়েছিলেন।’
সালাউদ্দিন কাদের আরো বলেন, ‘দুই জাতি তত্ত্ব ভুল ছিলো সে কথাই বলার চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তাদের মতে, একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হওয়া দরকার ছিলো। দেশের সীমানা ভেঙে অন্য দেশের সঙ্গে মিলে যাওয়ার যে চেষ্টা তা বঙ্গবন্ধুর ৭২ এর সংবিধানে নেই। এটা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নীতি নয়। তাহলে কি এটা বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতি?’ তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সংবিধানের লংঘন। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাই সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানা। আর বাংলাদেশের বিচারপতিদের সংবিধান রক্ষার শপথ নিতে হয়েছে।’
এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ‘ফাঁসিতো দিবেনই। আমি তাতে ভয় পাই না। তবে আমি যতোদিন বেঁচে থাকবো ততদিন এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করে যাবো।’ পরে জবানবন্দি অসমাপ্ত অবস্থায় মামলার কার্যক্রম আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
এর আগে সকালে সাফাই সাক্ষীর সংখ্যা পাঁচজন থেকে বাড়ানোর জন্য করা আবেদনের ওপর শুনানি করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। একই সঙ্গে তার চারজন আইনজীবী দেখা করার অনুমতি চেয়েও আবেদন করেন। পরে আদালত তার সঙ্গে দেখা করার জন্য দুইজনকে অনুমতি দেয়।