কবি আবুল হোসেন মিয়া

‘একটু খানি স্নেহের কথা একটু ভালোবাসা গড়তে পারে এই দুনিয়ার শান্তি সুখের বাসা। একটু খানি অনাদর আর একটু অবহেলা ঘুচিয়ে দিতে পারে সবার সকল লীলাখেলা একটু খানি ছোট্ট শিশুর একটু মুখের হাসি মায়ের মনে, সবার প্রাণে বাজায় সুখের বাঁশি’। উপরের ছোটদের কবিতাটি আমরা অনেকেই পড়েছি। দীর্ঘদিন ধরে এই কবিতাটি চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্য তালিকাভূক্ত ছিলো। এ কারণেই কবি আবুল হোসেন মিয়া ছিলেন ছোট-বড় সবার পরিচিত এবং সবার প্রিয় কবি। আবুল হোসেন মিয়া মৃত্যুর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের বাসায় ভাড়া করা একটি কক্ষে থাকতেন। মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থ হয়ে তিনি গ্রামের বাড়ি ফিরে যান এবং দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরে ২ ফেব্রুয়ারি ২০০০ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ বাংলাদেশ বেতার থেকে স্থানীয় সংবাদে প্রথম প্রচারিত হয়। পত্র-পত্রিকায় তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে নাই। অনেক দূর থেকেই আমাদের কাছ থেকে তিনি বিদায় নিলেন। যথা সময়ে তার মৃত্যু সংবাদটি আমরা জানতে পারি নাই। কবি আবুল হোসেন মিয়া ছিলেন সাদাসিধে মানুষ। সারা জীবন তিনি শহরেরই কাটিয়েছেন, কিন্তু তাঁর লেখা ও আচরণ থেকে গ্রামের সজীব স্পর্শ কখনো মুছে যায় নাই। শৈশব থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন এবং পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হয়। কোন হৈ চৈ নয়, নিভৃতে-নীরবে লেখাটি পৌঁছে দিতেন বিভাগীয় সম্পাদকের টেবিলে। ছাপা হলে খুব খুশি হতেন, না ছাপা হলে কোন দুঃখ ছিলো না। এভাবেই লেখা প্রকাশিত হয়েছে দীর্ঘকাল। অবশেষে বাংলা বাজার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম ছড়ার বই ‘তালবেতালের ছড়া।’ আবুল হোসেন মিয়া লিখছেন প্রচুর। আমাদের সময়কার মাসিক কচি-কাঁচা, টাপুর-টুপুর, মাসিক মুকুল, খেলাঘর, সবুজ পাতা ছাড়াও সকল পত্রিকায় শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি নিয়মিত লিখেছেন। আবুল হোসেন মিয়ার যতো লেখা প্রকাশিত হয়েছে সে তুলনায় তাঁর বইয়ের সংখ্যা কম। সবুজ গাঁয়ে সবুজ ও তালবেতালের ছড়া এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ‘একটু খানি’ শিরোনামে একটি ছড়া-কবিতার বই প্রকাশ করে। ছোটদের জন্য লেখা এসব বই ছাড়াও ইশকুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে কবি আবুল হোসেন মিয়া’র বেশ কয়টি লেখা তালিকাভুক্ত ছিলো। নিজের বই প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে ধর্ণা দেয়া তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এতো লিখেও তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। কারো লেখা ভালো লাগলে অকপটে প্রশংসা করতেন। কবি আবুল হোসেন মিয়া ১৯২০ সালে ১ অক্টোবর মাদারীপুর জেলার রাজৈরের কুঠিবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম কবিরাজ সোনামুদ্দীন মিয়া এবং মায়ের নাম হাজেরা খাতুন। শৈশব-কৈশরে তিনি রাজৈর ও মাদারীপুরে পড়ালেখা করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি বরিশাল বি.এম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বি.এ পাস করেই সরকারি ইশকুলে চাকরি গ্রহণ করেন। বরিশালে জিলা ইশকুল, গভ: ল্যাবরেটরি ইশকুল ও আর্মানিটোলা হাই ইশকুলে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে এম. এ পাস করে প্রথম তেজগাঁও, পরে নটরডেম কলেজে অধ্যাপনা করেন। অবসর গ্রহণ করে তিনি গ্রামে ফিরে যান নাই। শুধু লেখালেখি, ছাত্রদের পড়াশোনার কারণে খুব অল্প টাকায় একটি সিটভাড়া করে ঢাকায় থেকেছেন। অথচ তিনি ছিলেন গ্রামের মানুষ! বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে গ্রামের গল্প বলতেন। তাঁর কবিতা ছড়া ও গল্পে গ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের কথা, আনন্দ গাঁথার চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি আবুল হোসেন মিয়া যখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র, তখন তাঁর প্রথম লেখা ‘ভরাভাদরে’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালের শিশু সাথীর ভাদ্র সংখ্যায় ওই লেখাটি প্রকাশিত হলে রাজৈর সাব-রেজিস্টার অফিসে হই চই শুরু হয়ে যায়। ওই অফিসে তখন ‘শিশু-সাথী’ পত্রিকা রাখা হতো। কবি আবুল হোসেন মিয়া’র অনেক কবিতা, ছড়া ও গল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সংগ্রহের অভাবে সে সব লেখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কে সংগ্রহ করে সংকলিত করবে? কবি আবুল হোসেন মিয়া ছিলেন ছোটদের প্রিয় মানুষ। তিনি শিশু-কিশোরদের খুব ভালোবাসতেন, কাছে ডেকে আদর করতেন। তিনি নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ছোটদের পড়াতেন। বিনিময় কোনো টাকা-পয়সা গ্রহণ করতেন না। নির্লোভ এ মানুষটি সব সময় হৈ-হুল্লোড়, এড়িয়ে চলতেন। সারা জীবনই ছাত্র-ছাত্রীদের সত্যিকার আদর্শবান মানুষ হওয়ার জন্য উপদেশ দিতেন। অহংকারীদের তিনি পছন্দ করতেন না। সহজ-সরল জীবন-যাপন করা তিনি খুব পছন্দ করতেন। আমরা কবি আবুল হোসেন মিয়ার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।