শুভ্রার বিষণ্ন দিন
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৩, ১৮:২০
আয়নায় দাঁড়িয়ে জিহ্বা বার করে দেখছিলো শুভ্রা। বেশ লাল হয়েছে জিহ্বা। পান খেলে এমনই হয়। আব্বু বলেছেন, ছেলেবেলায় এ অভ্যাসটি তারও ছিলো। দাদুর বাটা থেকে পান নিয়ে খেয়ে চুপিচুপি আয়নায় জিহ্বা দেখতেন ঘরের কোণায়। জিহ্বার লাল রঙ দেখে বেশ স্ফূর্তি হতো মনে। ছোট্ট শুভ্রার দাদু নেই। নানু আছেন। তাদের সাথেই থাকেন। দিনে পনের-বিশটা পান খান। দেখা-দেখি শুভ্রাও খায় দিনে দু’একটা। পান খাওয়া মানেই জিহ্বা ও ঠোঁট লাল করা। আয়নায় তা দেখে পরম আনন্দ লাভ। একবার দু’বার দেখা নয়, অনেক অনেকবার। এবারে জিহ্বা বার করতে গিয়ে থমকে যায় শুভ্রা। আয়নায় ওটা কার ছবি দেখা যায়? কে তাকিয়ে আছে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে? মানুষ তো নয়। তাহলে? ওমা, আস্তো এক বানর যে! কী আশ্চর্য! হা করে জিহ্বা দেখায়! শুভ্রা ঘাড় ঘুরাতেই আবার দাঁত খিঁচায়। চিত্কার করে ওঠে শুভ্রা। আম্মু, আম্মু, উ-।
রান্নাঘর থেকে আম্মু দৌড়ে আসেন। উত্কণ্ঠায় বলেন, কী হয়েছে মামনি? কী হয়েছে? শুভ্রা দু’হাতে মুখ ঢেকেছে। আম্মু মাথায় হাত রেখে বলেন, কী হয়েছে সোনামনি? এমন করছো কেন? শুভ্রা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, বানর। বানর ওইখানে।
কোথায়? কোথায় বানর দেখলে? টিভিতে? না, জানালায়। জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। উ-উ।
আম্মু জানালায় তাকিয়ে দেখেন বানর-টানর কিছু নেই। কতগুলো কাক বাইরে কা-কা ডাকছে। মাঝে-মধ্যেই ওরা ঝাঁক ধরে এমন কা-কা করে। কোনো কারণও হয়তো থাকে। তা নিয়ে ভাবা হয় না কোনোদিন। আম্মু শুভ্রার মাথায় হাত রেখে বলেন, কই জানালায় তো কিছু নেই। কোথায় বানর? শুভ্রা ভয়ে ভয়ে মুখ থেকে হাত সরায়। জানালায় তাকিয়ে দেখে আম্মুর কথাই ঠিক। বানর তো নেই। কোথায় গেলো বানর? আস্তো ভেংচি কাটতে দেখেছে সে। মনে মনে দেখে সে দৃশ্যটি। আম্মু বলেন, ভুল দেখিসনি তো? ঢাকা শহরে বানর কোত্থেকে আসবে? শুভ্রা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। তখনই নিচ থেকে শব্দ ভেসে আসে ওই বানর। বানর। ওই বান্দর। হুট হুট। খট করে একটা ঢিল এসে লাগে বন্ধ জানালায়। ও পাশে বস্তি আর ঝিল। ছেলেপুলেরা ঝিলপাড়ে দাঁড়িয়ে প্রায়ই ঢিল ছুঁড়াছুঁড়ি করে। কিন্তু জানালায় ঢিল তো ছুঁড়ার কথা নয়। আম্মু দৌড়ে বারান্দায় যান। নিচে চোখ যেতেই দেখেন একদল ছেলেপুলে তাকিয়ে আছে এ ফ্ল্যাটের সানসেটের দিকে। আম্মুও সেদিকে তাকান। কী আশ্চর্য! সত্যিই তো বানর এসেছে এখানে। তাকিয়ে আছে শূন্যে। আর তাই দেখে কাকগুলো কা-কা জুড়ে দিয়েছে। অনেকগুলো মাছি উড়ছে বানরের চারপাশে। খাড়া ওপরে লাফ দিয়ে ধরার চেষ্টা করছে সে মাছিগুলোকে। প্রতিবার লাফ দেয় আর কাকগুলো শোরগোল করে ওঠে। মজার খেলা।
আম্মু ডেকে ওঠেন শুভ্রা শুভ্রা বলে। বলেন, দেখে যা কী মজার কাণ্ড। শুভ্রা দৌড়ে বারান্দায় যায়। বানর তখন স্থির হয়েছে। মাছিগুলো উড়ে এসে বসতে চায় তার গায়ে। তখনই আচমকা থাবা মারে সে তাদের দিকে। কাকগুলো আবারো শোরগোল করে ওঠে। ফুটবল মাঠে একটা তুমুল গোল যেন হয়ে গেছে। বস্তির ছেলেপুলেগুলো তাকিয়ে আছে তাজ্জব হয়ে। শুভ্রারও মনে আনন্দ যেন আর ধরে না। আম্মুর আঁচল ধরে তন্ময় হয়ে চেয়ে দেখে সে। হঠাত্ কী ভেবে কাকগুলো একযোগে তেড়ে এলে বানরটা একলাফে সম্মুখের কদম গাছে উঠে যায়। ঢুকে পড়ে ডালপালার ভেতর। মাগরিবের আযান পড়ে। কাকগুলো আরো বেশ কিছুক্ষণ কা-কা করার পর নিশ্চুপ হয়ে যায়।
রাতে শুভ্রার আব্বু বাসায় ফিরলে বানর নিয়ে কথা ওঠে। আব্বু বলেন, পুরান ঢাকায় এখনও বেশ বানর আছে। সম্ভবত সেখান থেকেই বানরটা এদিকে চলে এসেছে কোনো কারণে। ঘুমাবার আগে শুভ্রার কাক, বানর আর মাছিদের কথা বেশ মনে পড়ে। ভাবে, প্রতিদিন যদি এমন খেলা দেখা যেত কী মজাই না হতো। সকালে উঠেও কি দেখা যাবে খেলাটা? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় গিয়ে উঁকি দেয় সানসেটে। শূন্য সানসেট। কাক উড়ছে এদিক-সেদিক। বানর-মাছিরা নেই। শুভ্রা চিন্তিত মনে স্কুলের জন্য তৈরি হয়। ভাবে বানর তো কাল বিকেলবেলা এসেছিল। আজও নিশ্চয়ই বিকেল হলে আসবে।
স্কুলব্যাগ কাঁধে শিগগিরই আব্বুর সাথে বেরিয়ে পড়ে শুভ্রা। আব্বু রিকশায় তাকে কিন্ডারগার্টেনে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে যাবেন। রিকশার উদ্দেশ্যে হাঁটছে তারা কিছুদূর। হঠাত্ই একদল ছেলেপুলের হৈ-হুল্লোড়ে থমকে দাঁড়ায় তারা। দেখে, একটা ছেলে রশির মাথা ধরে টানছে আর পেছনে অন্যরা হৈ-হুল্লোড় করছে। বস্তির ছেলেপুলে ওরা। কী টানছে ওভাবে? বাবা কৌতূহলে তাকান। দেখেন রশির মাথায় ছেঁচড়ে যাচ্ছে এক বানর। রক্তাক্ত মৃত তাতে সন্দেহ নেই। রাস্তা পাশের দোকানদার বলেন, কী রে, বানর মারছস কীল্যা? ছেলেগুলো বলে, বান্দর, বান্দর। পাজির হাড্ডি। হাঁড়িত্থোন খালি ভাত চুরি করে। আইজ দিয়া তিন রাইত। মারুম না ক্যানে? চাইলের যে দাম।
আব্বু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পা বাড়ান। রিকশায় উঠে বলেন, কবে যে এরা মানুষ হবে? চালের দাম বোঝে। জীবজন্তুর দাম এরা কী বুঝবে? শুভ্রা বলে, আব্বু বানরের কী দাম আছে? আব্বু ভারি গলায় বলেন, হ্যাঁ দাম আছে। অনেক দাম। পশু, পাখি, গাছপালা আমাদের বাসযোগ্য পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে। ওরা যদি শিক্ষিত হতো ওরাও তা বুঝতো। আব্বুর সাথে শুভ্রারও মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। আজ সারাদিন তার এমনই কাটবে।