জলবায়ু বিপর্যয় রোধে সর্বশেষ হতাশা প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৩, ২১:২৭
জলবায়ু বিপর্যয় রোধে জাতিসংঘের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনটি এক রাশ হতাশাসহ সদ্যই সমাপ্ত হইল জার্মানীর বন শহরে। জলবায়ু বিপর্যয় রোধ করিবার ক্ষেত্রে সময় যে খুব সামান্যই রহিয়াছে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞ মহলে তর্কের সমাপ্তি ঘটিয়াছে। এই ধরিত্রীকে বাঁচাইতে হইলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করিয়া পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার তাগাদা আসিতেছে অনেক দিন ধরিয়াই। কিন্তু চলতি মাসের তিন তারিখে শুরু হইয়া ১৪ তারিখে সমাপ্ত হওয়া ইউএন ফ্রেইমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) হইতে এই বার্তা আরেকবার পাওয়া গেল যে, জলবায়ু বিপর্যয় রোধে একান্তভাবে প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক পর্যায়ের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতি-রাষ্ট্রগুলির শাসক-শ্রেণীর মধ্যে এখন অবধি বোধের সমস্যা রহিয়া গিয়াছে। আরও উল্লেখ করিবার মত বিষয় এই যে, জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য আজিকার ধনী দেশগুলিই প্রধানতঃ দায়ী হইলেও দায়-দায়িত্ব লইবার ক্ষেত্রে তাহারা দুঃখজনকভাবে পিছাইয়া থাকিতেছে।
গত মাসে পৃথিবীর বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ তিন হইতে পাঁচ মিলিয়ন বত্সর পূর্বের, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ আজি অপেক্ষা ৪০ মিটার উচ্চে ছিল। অথচ এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির ব্যাপারে বিশ্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের তেমন কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাইতেছে না। জলবায়ু বিপর্যয়ের লক্ষণগুলি দিনকে দিন স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছেঃ প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলিতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িতেছে, আবহাওয়া চরমে উঠিয়া যাওয়াটা হইয়া উঠিতেছে নিত্যকার ঘটনা। ক্ষরার বিস্তৃতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের স্তর বাড়িয়া যাওয়া, হিমবাহ গলিতে থাকা, মহাসাগরের পানিতে এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি হইতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘোরতর হইয়া উঠিবার সঙ্কেত নিত্যই পাওয়া যাইতেছে। প্রসঙ্গত, জলবায়ু বিপর্যয় সরাসরি বিঘ্নিত করিতেছে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবী হইতে চরম দারিদ্র্য নির্মূল করিবার লক্ষ্যটিকে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষজনের দায় খুব সামান্য। অথচ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত গুরুতর দুর্ভোগগুলি তাহাদের উপরেই বেশি করিয়া পড়িতেছে। বন্যা, ক্ষরা, শস্যহানির মত বিপর্যয়ে দরিদ্রদের জীবন দিনকে দিন কঠিন হইয়া পড়িতেছে; অনিশ্চিত হইয়া পড়িতেছে। অথচ দেশে-দেশে সরকারগুলি এখন অবধি এই বিষয়ে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা লইতেছে না।
জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বন সম্মেলনে উল্লেখ করিবার মত তেমন কোন অগ্রগতি সাধিত হয় নাই। কিন্তু এই বিশ্বকে বাঁচাইতে হইলে বিলম্ব-বিলাসের সময় যে হাতে একেবারেই নাই তাহা বিশেষ করিয়া ধনী দেশগুলির বুঝিতে পারা উচিত। জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য ঐতিহাসিক দায়গুলি স্বীকার না করিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলির উপরেও দায়িত্ব পালনের সমান বোঝা চাপাইতে চাহে ধনী দেশগুলি। কিন্তু তাহাদিগকে এই অবস্থান হইতে সরিয়া আসিতে হইবে এবং বুঝিতে হইতে জলবায়ু বিপর্যয়ের পরিণতিতে ধনী-দরিদ্র সকল দেশকেই সমানভাবে ভোগ করিতে হইতেছে এবং ভবিষ্যতেও তাহার ব্যত্যয় হইবে না। প্রকৃতির নিকট মানুষের দায় গত কয়েক শতকে চূড়ান্তভাবে বাড়িতেছে। অনতিবিলম্বে দায়শোধের পূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ না করিলে মানবসভ্যতা নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবার মত ঝুঁকিও যে রহিয়াছে তাহা অনুধাবন করিয়া পূর্ণগতিতে কাজ শুরু করিবার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। বিশেষজ্ঞগণ বিপদের মাত্রা চিহ্নিত করিয়াছেন, নিদান বলিয়া দিয়াছেন। বাকি কাজ রাজনৈতিক নেতৃত্বের। পৃথিবীকে বাঁচাইতে চাহিলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন এক অর্থনীতির পথ ধরিতে হইবে যাহা পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও নিম্মমাত্রার কার্বন নিঃসরণ সম্পন্ন হইবে।