দেশ ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দুই মেরুতে বিভক্ত

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি নিজের পক্ষে দ্বিতীয় দিনের মতো সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, দেশ এখন ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দুই মেরুতে বিভক্ত। আর আমি একজন মুসলিম। মুসলিম হিসেবে আমার পরিচিতিটা পশ্চিমের অনেকের বড় উদ্বেগের কারণ। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের উপস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেয়া জবানবন্দিতে তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরেন। দ্বিজাতি তত্ত্বের সমালোচকদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এ তত্ত্বের সমর্থক হওয়ার কারণেই আমাকে টার্গেট করা হয়েছে। তার জবানবন্দির একটি বক্তব্যে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা আপত্তি জানালে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল দুই পক্ষের আইনজীবীদের সাবধান করেন। মামলার কার্যক্রম আজ বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সালাহউদ্দিন কাদেরকে এজলাসে আনা হয়। সাক্ষীর কাঠগড়ায় আনার পর তিনি বলেন, মামলার তিনটি মাপকাঠির মধ্যে থেকেই আমার বক্তব্য উপস্থাপন করবো। কখনও এর বাইরে গেলে আপনারা আমাকে থামিয়ে দেবেন। এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা আপনাকে থামাতে চাই না। আপনি একজন সংসদ সদস্য। ৩৩ বছর ধরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, ৪২ বছর পর আমাকে কেন এখানে নিয়ে আসা হলো? তাতো আমাকে বলতে হবে। জবানবন্দির শুরুতে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সংবিধান জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন তার ২ অনুচ্ছেদের প্রতি আস্থা রেখেই আমার রাজনীতিতে আসা। ১৯৭৮ সালে আমি রাজনীতিতে যোগ দেই। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এ অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে নির্ধারিত তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাকে স্বীকৃতি দিয়ে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার প্রকাশ পায়। রাষ্ট্রপক্ষ দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করে যে প্রস্তাব দিয়েছে তা দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি এক ধরনের বিদ্রূপ। যে তত্ত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তার বিরুদ্ধে গিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ প্রস্তাব বাংলাদেশকে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এ বক্তব্যে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমনসহ প্রসিকিউটররা বলতে থাকেন, এটা যাবে না। জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এটা আমার বক্তব্য। আপনারা আপনাদের যুক্তির সময় জবাব দিবেন। এ সময় প্রসিকিউটরদের সঙ্গে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের বাক-বিতণ্ডা হয়। ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কিছু বলছেন না। তিনি সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে বলছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বলছেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, সিকিম করার কথা বললে এত গা জ্বলে কেন। এসময় ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব কথাগুলো জবানবন্দি থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে সালাহউদ্দিন কাদের তার জবানবন্দিতে বলেন, এ প্রস্তাব বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব তা আমি বলতে চাই কিন্তু কিছু লোক তাতে মনক্ষুণ্ন হতে পারে। দ্বিজাতি তত্ত্বের কল্যাণে প্রাপ্ত কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বিখ্যাত আইনজ্ঞ যাদের নাম আমি স্মরণ করতে পারি তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, সাবেক প্রধান বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ আরও অনেকের কথা। যারা প্রত্যেকে আমাদের জাতির গর্ব। এ বক্তব্যের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির জবাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, দ্বিজাতি তত্ত্ব আমাদের জন্য কিভাবে সুফল বয়ে এনেছে তা বুঝানোর জন্যই এটা বলা প্রয়োজন। আমাদের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে নিয়েও আমি গর্বিত। তিনিও দ্বিজাতি তত্ত্বের ফসল। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এভাবে, সংস্কৃতিগতভাবে মুসলিম, শিক্ষাগত দিক থেকে ইংরেজ এবং দুর্ভাগ্যক্রমে জন্মগত কারণে হিন্দু। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি জন্মসূত্রে চট্টগ্রামী। এটা কোন দুর্ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম কখনোই নবাব সিরাজ উদদৌল্লার শাসিত অঞ্চলের অংশ ছিল না। আমি সিরাজ উদদৌল্লাকে স্বীকার করি না। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। মধ্যহ্ন বিরতি শেষ হওয়ার আগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার পরিবারের সদস্যরা যেন তার সঙ্গে দেখা করতে পারেন এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি চান। ট্রাইব্যুনাল বলেন, সোমবারই তো পরিবারের সদস্যরা আপনার সঙ্গে দেখা করেছেন। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিতো তা অস্বীকার করছি না। এজন্য আমি ট্রাইব্যুনালের কাছে কৃতজ্ঞ। ফাঁসির আসামির সঙ্গেও পরিবারের সদস্যরা মাসে একবার দেখা করতে পারে। এসময় ট্রাইব্যুনাল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের দেখা করার অনুমতি দেন। বিরতির পর দেয়া সাক্ষ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা নিপীড়নের শিকার। সোমালিয়া, বসনিয়া, গুজরাট, ফিলিস্তিন সারা দুনিয়ায় এখন মুসলমানরা নির্যাতিত হয়েছে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় মুসলিম উম্মাহ্র প্রতি আমার অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছি। মুসলিম খিলাফতের প্রতি আমার যে অঙ্গীকার তা কোনো রাজনৈতিক সীমায় বন্দী নয়। তিনি বলেন, দেশ এখন ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দুই মেরুতে বিভক্ত। আর আমি একজন মুসলিম। গতকাল জবানবন্দির বাইরেও কথা বলেন আলোচিত এই সংসদ সদস্য। কখনও কখনও তীর্যক ভাষায় জবাব দিয়েছেন প্রসিকিউটরদের আপত্তির। রাজনীতিবিদদের সমালোচনা হবে চিরায়ত সে উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, আপনারা আমার সমালোচনা করেন তাতে তো আমি আপত্তি করি না। এটা হচ্ছে হাঁসের গায়ে পানি ছিটানোর মত। ঝাঁকি দিলে এ পানি পড়ে যাবে। এর আগে সকালে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। তারা একঘণ্টা কথা বলেন।